বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৪

এক দিনের বৌ

-১ দিনের জন্যে বউ হবি আমার? --হুমমম হবো কিন্তু এর জন্যে অনেক টাকা দিতে হবে আমাকে পারবি। --কতো টাকা চাই তোর সেইটা বলো আমাকে। --বেশি না মাত্র ৩ হাজার টাকা দিলে তাতেই হবে। পারবি তো দিতে নাকি। --হাহাহা হাহহা হাহাহ মাত্র ৩ হাজার টাকা তোর এই শরীরটার দাম। --পতিতাদের শরীর দাম এমনি। --আচ্ছা একটি প্রশ্ন করি তোকে? সত্যি সত্যি উত্তর দিবি কিন্তু আমাকে। --হুমম বল। --তুই কেনো এই পথে এসেছিস যদি একটু বলতি দয়া করে আমাকে। --একটা বেইমানকে ভালোবাসছিলাম সে আমাকে বিয়ে করার কথা বলে এখানে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয়। তার পরে থেকে এখানেই আছি। --তোর মনে চায়না এখনা থেকে বের হতে। --মন চাইলে কি আর যাওয়া সম্ভব বল। এখানে থেকে বের হতে গেলে অনেক টাকার দরকার যা আমার কাছে নাই। আর হবেওনা কখনো। --কেনো কাজ করে টাকা পাসনা। --পাই কিন্তু এই টাকা আমাদের এখানে যে মালিক আছে সে নিয়ে নেয়। --ওহ! সংসার করবি। --ইচ্ছেতো হয় সংসার করার? কিন্তু সেটাকি কখনো সম্ভব বল। --তুই চাইলেই সম্ভব। --কে বিয়ে করবে এই ব‍্য*শা কে বল। যে কিনা দেহ ব‍্যবসা করে হোটেরে। --আমি বিয়ে করবো তোকে। --পাগল হয়েছিস তুই। --মনে কর সেটাই! বল বিয়ে করবি কিনা আমাকে। --তুই আমার মতো একটা খারাপ মেয়ে বিয়ে করবি। নাকি অন‍্য কোথাও ভালো দামে বিক্রি করবি। --একবার এই হাতটি ধরে দেখনা। --আমাকে বিয়ে করলে এই সমাজে মুখ দেখাতে পারবি তুই। --হুমম পারবো। --বলাটা যতো সহজ? করাটা কিন্তু এর থেকেও বেশি কঠিন ভবে দেখ। --আমার ভেবে দেখা শেষ। বল এখানে থেকে বের করতে হলে কতো টাকা লাগবে। --এই দুই লক্ষ টাকার মতো। --ঠিক আছে। আমি সব ব‍্যবস্থা করতেছি। "এর পরে হাসিব সেই খানের লোক গুলার সঙ্গে কথা বলে রিয়াকে বের করার সব ব‍্যবস্থা করে? তো রিয়া বের হওয়ার পরে হাসিব কে জিঙ্গেস করে" রিয়া : তুই কি সত্যি আমাকে বিয়ে করবি। হাসিব : হুমম সত্যি বিয়ে করবো। রিয়া : আচ্ছা আমার থেকে কতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে? তাদের ছেরে তুই আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলি কেনো। হাসিব : আগে বল আমি কে। রিয়া : চিনিনা তোকে। হাসিব : আমি সেই হাসিব যে তোর পিছনে ৩টি বছর ঘুরেছে একটু ভালোবাসার জন্যে কিন্তু তুই পাত্তা দিতিনা। এর পরে হঠাৎ একদিন নিখোজ হলি। "হাসিবের মুখে এই কথাটি শুনে রিয়া বলে " রিয়া : ওহহহ তুমি সেই হাসিব যে আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। সত্যি তোমাকে আমি চিনতে পারিনাই। হাসিব : হুম আমি সেই হাসিব। জানো তুমি নিখোজ হওয়ার পরে তোমাকে অনেক খুজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি। কয়েক বছর পরে হঠাৎ জানতে পারি তোমাকে নাকি একটি হোটেলে বিক্রি করেছে। যেখানে থেকে তোমাকে বের করতে গেলে অনেক টাকা লাগবে। যা শুনার পরে আমি চিন্তা ভাবনা করি তোমাকে সেখান থেকে বের করবো। তার জন্যে আমি টাকা জমাতে লাগলাম। আর সেই টাকা জমানোর জন্যে কাজ করতাম আবার টিউশনি করতাম। এই ভাবে যখন টাকা ম‍্যানেজ হওয়ার পরে । আজকে তোমাকে সেই টাকা দিয়ে বের করে আনলাম। "হাসিবের মুখে এই কথা গুলা শুনার পরে রিয়ার চোখে কখন যে পানি চলে এসেছে নিজেই বুঝতে পারেনি। হাসিব : এইই কান্না করছো কেনো। রিয়া : একটা মানুষ আমার জন্যে এতো কষ্ট করেছে। যা আমি কখনো ভাবতেই পারিনি। হাসিব : আরে ব‍্যপার না। রিয়া : কি চাও আমার কাছে বলো। হাসিব : তোমাকে বউ হিসেবে চাই আমার কাছে। রিয়া : হুমমম আমি রাজি। হাসিব : তাহলে চলো কাজি অফিসে। রিয়া : পাগল একটা। হাসিব : হুমম তোমার। রিয়া : আমারি তো❣ "আসলে ভালোবাসা এমন একটি জিনিস যাকে একবার ভালোবাসলে তাকে কখনো মন থেকে মুছে ফেলা যায়না। গল্পটি কাল্পনিক আপনাদের বিনদনের জন। অনু_গল্প : #ভালোবাসা_

রবিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৪

সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্প: বহ্নিশিখা

মঞ্জুর চৌধুরী, ডালাস (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে (একটি গাছ কীভাবে বহু বছর পুরোনো খুনের মামলার প্রধান সাক্ষী হয়ে একটি হত্যা মামলায় ন্যায়বিচার পাইয়ে দিল, তা নিয়ে গত ১৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোর দূর পরবাস বিভাগে ‘বৃক্ষের সাক্ষ্য’ গল্পের মাধ্যমে পাঠকদের পরিচয় করে দিয়েছিলাম ডিটেকটিভ আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে শুনে লিখেছিলাম গল্পটি। সেটিও ছিল সত্য ঘটনার ওপর আধারিত। আজ আজিজ ভাইয়ের আরেকটি সত্য গল্প নিয়ে পাঠকদের কাছে হাজির হলাম।) সাদা ধবধবে শার্ট ও আকাশি রঙের ট্রাউজারে অবসরপ্রাপ্ত হোমিসাইড ডিটেকটিভ (শিকাগো পিডি, ডালাস পিডি ও পরবর্তী সময়ে প্রাইভেট) আজিজ ভাইকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। তিনি এমনিতেই সুপুরুষ। ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা। সুঠাম দেহের অধিকারী এক বয়োজ্যেষ্ঠ। মাথার চুলে পাক ধরেছিল বহু যুগ আগে। এখন পুরো মাথায় ধূসর চুলের রাজত্ব। তবে এই বয়সেও তাঁর চুল বেশ ঘন। ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ান। গালভর্তি চাপ দাড়ি। প্রতি সপ্তাহেই ট্রিম করেন। কোনো অবস্থাতেই আধা ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেন না। দাড়িতে হয়তো তিনি রং মাখেন। কারণ তাঁর দাড়ি থাকে কুচকুচে কালো। ধূসর চুল এবং কালো দাড়িতে তাঁকে খুবই সুন্দর মানায়। বাংলাদেশের বিখ্যাত অভিনেতা ও বর্তমানে রাজনীতিক আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে তাঁর চেহারার দারুণ মিল আছে। আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। এক দশক হয়ে গেল। পরিচয়ের ঘটনাটাও ছিল বেশ নাটকীয়। সেটা পরে একদিন বলা যাবে। আপাতত ভিন্ন একটি গল্প বলা যাক। যে গল্পে খুন আছে। জখম আছে। রহস্য আছে। প্রথম পরিচয়ের গল্প সেই তুলনায় অনেক পানসে। কোনো পাঠকই পড়তে আগ্রহী হবেন না। আমার অ্যাপার্টমেন্টে আজিজ ভাই একদিন বেড়াতে এলেন। তত দিনে আমার নতুন সংসার হয়েছে। বউ দেশ থেকে চলে এসেছে এক বছর হলো। সে ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। আমিও মোটামুটি জুতসই একটি চাকরি জোগাড় করে ফেলেছি।একটি একটি ইট গেঁথে আমরা সংসার গড়ছি। স্বপ্ন দেখছি নতুন বাড়ি কেনার। তার আগে নতুন গাড়ির। বর্তমান গাড়িটা বেশ পুরোনো হয়ে গেছে। কয়েক মাস পরপর নানা বাহানায় গ্যারেজে বেড়াতে যায়। বিস্তর খরচাপাতির ব্যাপার। পথেঘাটে কখনো থেমে গেলে তো কথাই নেই। তো ট্রাক ডাকতে হয়। তুলে নিয়ে গ্যারেজে নিতে হয়। অর্থের সঙ্গে সঙ্গে সময়ের অপব্যয়। এর চেয়ে নতুন গাড়ি কেনা সাশ্রয়ী। এরই মধ্যে বউ প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে। আমেরিকান বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীরা বলছিলেন, সংসার ঠিকঠাক মতো গুছিয়ে তবেই বাচ্চা নেওয়া উচিত। এদিকে আমার মতে, সংসার কখনোই গোছানো হয় না। আজীবন আমরা গোছাতে থাকি। চাকরিতে একটা প্রমোশন হলেই আমি মোটামুটি সেট হয়ে যাব! প্রমোশন হলে পরে, একটা বাড়ি কিনে ফেললেই আমি সেট হয়ে যাব। বাড়ি কেনা শেষ হলে, একটা ভালো গাড়ি না কিনলে এইবার চলছেই না। নতুন গাড়ি কেনা শেষে আরেকটু বড় বাড়ি কেনার দিকে মনোযোগ যায়। সেটার জন্য চাকরিতে আরেকটা প্রমোশনের আশা। যেহেতু একটা নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থানে পৌঁছে গেছি, সেটা জানান দিতেই আরও একটা দামি গাড়ি লাগবেই। এবং এভাবেই একটা পর্যায়ে গোছাতে না পারার আফসোস নিয়েই পৃথিবী ত্যাগ করি। কাজেই সময় থাকতে যা করার করে ফেলা ভালো। বিদেশিদের অবশ্য পয়েন্ট অব ভিউ ভিন্ন। তাঁরা দীর্ঘদিন সংসার করার পরও একে অপরকে ঠিক ভরসা করতে পারে না। যেকোনো মুহূর্তেই তাঁদের বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। দেখা যায় কয়েক যুগের সংসার অতি তুচ্ছ কোনো মতবিরোধে গুঁড়িয়ে গেল। সেই সময়ে বাচ্চাকাচ্চা থাকলে উল্টো ঝামেলার সৃষ্টি হয়। কাস্টডি, অ্যালামনাই ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। যাহোক, প্রেগনেন্সির তখনো আর্লি স্টেজ চলছে। বাচ্চার লিঙ্গ এখনো জানা সম্ভব হয়নি। আমরা প্রতিটা ক্ষণ চরম উত্তেজনায় কাটাই। বাচ্চার রুম গোছানো, ফিডার, বিছানা, ডায়পার ইত্যাদি কেনা থেকে শুরু করে কত কিছু নিয়ে যে পরিকল্পনা করি! ছেলে হলে নাম হবে রিসালাত। আমার সাফ কথা, ক্লাস থ্রিতে থাকতে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম আমার যদি কখনো ছেলে হয়, তবে তাঁর নাম হবে রিসালাত। বউ চোখ কপালে তুলে বলে, তুমি ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়ে বাচ্চাকাচ্চার নাম নিয়ে চিন্তা করতা? আমি তো সে সময়ে বিয়ে কী সেটাই বুঝতাম না। আমি মুখ বেকিয়ে বলি, সেটা তোমার সমস্যা। আমি অ্যাডভান্স চিন্তা করি, এইটা আমার গুণ! তাই বলে এত অ্যাডভান্স? ক্লাস থ্রি? আমাকে যাতে কেউ ইঁচড়ে পাকা না ভাবেন তাই ঘটনা একটু বিস্তারিত বলা যাক। আমার স্কুলে এক হারামজাদা কিসিমের ছেলে ছিল। যে আমাকে বুলি করত। কীভাবে বুলি করত সেটা না হয় না–ই বা বললাম। কিন্তু ছেলেটাকে আমি দেখতে পারতাম না। কিন্তু মানব মস্তিষ্কের অদ্ভুত খেয়ালে ওই বদমাশটার নামটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। তার নাম ছিল রিসালাত। এমন আনকমন নাম আমি আমার সেই ক্ষুদ্র জীবনে কোথাও শুনিনি। আশপাশের বন্ধুদের নামগুলো তখন খুবই কমন। জাকির হোসেন, মুহিবুর রহমান, আসিফুল হক ইত্যাদি। রিসালাত নামের মধ্যে একটা ঝংকার ছিল বলে মনে হতো। ছেলের জন্য রিসালাত নামটা তখনই ঠিক করেছিলাম। আর মেয়ে হলে? বউয়ের ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্ন। বহ্নিশিখা। যখন থেকে সুনীলের পূর্ব পশ্চিম বইটা পড়েছি তখন থেকেই এই নামটি আমার প্রিয়। বউ বলল, খবরদার, তুমি আমার বাচ্চার নাম রাখতে পারবে না। আমি বললাম, বহ্নিশিখা নামটিতে সমস্যা কী? বউ একই স্বরে বলল, আমেরিকান কেউ এই কঠিন নাম উচ্চারণ করতে পারবে? রিসালাত হয়ে যাবে রিজ আর বহ্নিশিখা যে কী হবে সেটা আল্লাহ মালুম। গুড পয়েন্ট। আমাকে যেমন আমার কিছু বন্ধুবান্ধব ম্যানি ডাকত। বউয়ের নাম নুসরাত, অফিসে লোকেরা তাঁকে নাজরাট, নুজ্রেট, নাসর্যাট ইত্যাদি নামে ডাকে। একজন তো আরও শর্টকাটে ডাকে নু। আল্লাহর মেহেরবানি! আমার শ্বশুর সাহেব তাঁর ছোট কন্যার নাম গুলশানা রাখেননি, তাহলে এরা নামটি ছোট করে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে দিত। সে যাক, আমাদের এই কথোপকথন চলছিল যখন আজিজ ভাই আমাদের বাড়িতে ছিলেন। স্টুডেন্ট ও ব্যাচেলর অবস্থায় বহুদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করেছি। এখন তাঁকে মাঝেমধ্যে আমার বাড়িতে এনে খাওয়াই। সত্তর-ঊর্ধ্ব এই বয়স্ক ব্যক্তিটিকে আমি তো খুব পছন্দ করিই, আমার স্ত্রীও তাঁকে খুব সম্মান করে। তাঁর মুখে তাঁর চল্লিশ বছরের হোমিসাইড ডিটেকটিভ ক্যারিয়ারের সত্য গল্পগুলো সে–ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। মেয়ের নাম বহ্নিশিখা রাখব বলে তিনি নিজে থেকেই বললেন, নামটি চমৎকার। কিন্তু আসলেই আমেরিকানরা এই নামটির বারোটা বাজিয়ে দেবে। তুমি একই অর্থের অন্য কোনো সহজ নাম রাখো। আমি বললাম, আগুনের প্রতিশব্দগুলো তো আরও খটমট। অনল, পাবক, দহন, সর্বভুক, শিখা, হুতাশন, বৈশ্বানর, কৃশানু, বিভাবসু, সর্বশুচি, হোমাগ্নি বীতিত্রোর, জ্বলন, শিখাবৎ, শিখিনু, বায়ুসখা…ইত্যাদি। তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, বাপরে! তুমি দেখি পুরো ডিকশনারি নামিয়ে ফেলেছ। এতগুলো প্রতিশব্দ মুখস্থ করলে কীভাবে? হেসে বললাম, আমার মাঝে মাঝে অতি ফালতু বিষয় মাথায় জমে থাকে। স্কুলে থাকতে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের জন্য মুখস্থ করেছিলাম, মাথা থেকে বেরোচ্ছে না। তারপর গলার স্বর পাল্টে বললাম, তবে আমার মূল পয়েন্ট নামের অর্থ না, নামটাই আমার পছন্দের ছিল। না হলে আগুন মোটেও রোমান্টিক বিষয় না যে বেহেশতের ফুলের নাম আমি নরকের উপাদানের নামে রাখব। তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, ভ্যালিড পয়েন্ট। আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, আমি আগুন খুবই ভয় পাই। দেখেন না, আমি বাড়িতে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করি। গ্যাসের চুলায় আমার ভীতি আছে। ছোটবেলায় বিটিভির খবরে প্রায়ই গ্যাসের সিলিন্ডার বার্স্ট করে বাড়িতে আগুন লাগার খবর দেখাত। আজিজ ভাই হেসে বললেন, আরে না। গ্যাস থেকেও যেমন আগুন লাগতে পারে, ইলেকট্রিসিটি থেকেও তেমনি বাড়িতে আগুন লাগতে পারে। সব ক্ষেত্রেই সাবধানতাটা জরুরি। তারপর হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেছে এমনভাবে তিনি বললেন, আচ্ছা, আগুন রিলেটেড একটি ইন্টারেস্টিং কেসের গল্প তোমাকে কী আমি কখনো শুনিয়েছি? তাঁর বলা যেকোনো গল্পই আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে। যখন ব্যাচেলর ছিলাম। তাঁর বাড়িতে সপ্তাহে এক দিন হলেও যেতাম কেবল গল্প শোনার আশায়। তিনি বললেন, ওই যে এক নারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, তাঁর সন্তানদের পুড়িয়ে মারার অভিযোগে…বলেছিলাম সে গল্প? তাঁর কাছে কমসে কম পঞ্চাশটির বেশি গল্প আমি শুনেছি। তবে এমন কোনো গল্প মনে করতে পারলাম না। তিনি বললেন, তাহলে শোনো, এটা খুবই ইন্টারেস্টিং একটি কেস। যদিও এই কেসে আমি বিন্দুমাত্র ইনভলভড ছিলাম না। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জড়িত ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই শোনা। তবে এ কেস থেকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য অনেক কিছুই শিক্ষণীয় ছিল। জীবনে খুব কম এমন কেসের অভিজ্ঞতা হয়। আমি ও আমার বউ আজিজ ভাইয়ের সামনের সোফায় গা এলিয়ে বসলাম। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি আমাদের ভালো লাগে। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প শুরু করলেন। বরাবরের মতোই, আমি তাঁর ভাষাতেই পুরোটা লিখছি। ঘটনার সূত্রপাত অনেক ভোরে। ঘড়িতে তখন ধর চারটা সাড়ে চারটা বাজে। নাইন ওয়ান ওয়ান ডিস্প্যাচার একটি কল পেল যে এক নারী জানাচ্ছেন তাঁর বাড়িতে আগুন লেগেছে। ওপরের ঘরে আগুন ছড়িয়েছে। তাঁর বাচ্চারা আটকা পড়েছে। এখুনি যেন তাঁকে সাহায্য করা হয়। দুই মিনিটের মধ্যেই পুলিশ হাজির হলো। কিন্তু অবস্থা খুব খারাপ। সিঁড়ি ছাড়া ওপরে ওঠার আর কোনো পথ নেই। ফায়ার রেসকিউর লোকজন ছাড়া কারও পক্ষে যাওয়াও সম্ভব না। ওই নারী পাগলিনীর বেশে ড্রয়িংরুমে ছোটাছুটি করছেন। বারে বারে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন। পুলিশ অফিসার তাঁকে জোর করে আটকে রাখলেন। ফায়ার সার্ভিস আসতে আরও এক মিনিটের মতো সময় নিল। দৌড়ে আগুনে ঢুকে গেল এবং দুই বাচ্চাকে উদ্ধার করে এনে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাল। নারীকেও হাসপাতালে পাঠানো হলো। ফায়ার সার্ভিস অনেক পরিশ্রম করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলো। কিন্তু আফসোস, বড় মেয়েটি বাঁচলেও সতেরো মাস বয়সী ছেলেটিকে কেউ বাঁচাতে পারল না। তিন্নি (আমার স্ত্রীর ডাকনাম) চাপা আর্তনাদ করে উঠল। এমনিতেই সে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর তার পরিমাণ আরও বেড়েছে। যেকোনো শিশুর মধ্যেই এখন সে নিজের অনাগত সন্তানকে দেখে। আজিজ ভাই গল্প চালিয়ে গেলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় আমরা রুটিন ইনভেস্টিগেশন করি। এইটা নিয়ম। স্টেট আর্সন (অগ্নিসংযোগ) ইনভেস্টিগেটররা এসে খুঁটিনাটি পরীক্ষা করলেন। ফেডারেল আর্সন ইনভেস্টিগেটররাও এলেন। আগুনের ব্যাপারে কিছু তথ্য তোমাদের দিই। তাহলে তোমাদের বুঝতে সুবিধা হবে। আগুন সব সময় উৎপত্তি স্থানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। ক্ষতির পরিমাণ দেখেই ইনভেস্টিগেটররা বুঝতে পারেন আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছে। তাঁরা আবিষ্কার করলেন নিহত শিশু…, কী যেন নাম ছিল ভুলে গেছি। ধরো যশোহা। যশোহার রুমের ক্লজেট সবচেয়ে বেশি পুড়েছে। মেঝে থেকে ‘ঠ’ শেপের পোড়া দাগ ছাদ স্পর্শ করেছে। ছাদ পুড়ে ছাই হয়ে ধসেছে। তাঁরা রিপোর্ট করলেন আগুন মেঝে থেকে ওপরের দিকে গেছে। অ্যাটিকে (চিলেকোঠার মতো ফাঁকা অংশ) একটি পোড়া ঝুলন্ত ইলেকট্রিক তার পাওয়া গেছে। তাঁরা নিশ্চিত করেছেন ওটা আগুন লাগার পরে পুড়েছে। ইলেকট্রিক্যাল আউটলেটও পরীক্ষা করা হয়েছে। সেগুলো থেকেও আগুন লাগেনি নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেহেতু আগুন লাগার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ তাঁরা খুঁজে পাননি, তাই তাঁরা রিপোর্ট দিলেন, নিশ্চিত এটি কেউ অগ্নিসংযোগ করেছে। এখন একটু জরুরি তথ্য দিয়ে রাখি। ঘটনার রাতে ভদ্রমহিলা নিচে ড্রয়িংরুমে সোফায় ঘুমাচ্ছিলেন। বাচ্চারা ওপরে বেডরুমে ঘুমাচ্ছিল। শীত আগমনী রাত ছিল। প্রথমবারের মতো স্পেস (মোবাইল) হিটার চালু করে ওই নারী ঘুমাচ্ছিলেন। যখন ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা তাঁর বাচ্চাদের উদ্ধারে এলেন, তিনি নিজ হাতে স্পেস হিটার সরিয়ে তাঁদের জায়গা করে দিয়েছিলেন। ওই নারী সম্পর্কেও কিছু তথ্য দিয়ে দিই। ভদ্রমহিলার বয়স তিরিশের ঘরে। ককেশিয়ান। সিঙ্গেল মাদার। স্বামীর সঙ্গে তালাক হয়েছে এক বছরও হয়নি। এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। সদ্যই এক লোকের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্ক হয়েছে। যদিও ভদ্রলোক তাঁর সঙ্গে একই বাড়িতে থাকা শুরু করেননি। যাহোক, এসব ক্ষেত্রে বাড়িতে উপস্থিত লোকজনকেই সন্দেহ করা হয়। প্রথমেই সন্দেহ গেল বড় বোন ব্রিটনির (নাম মনে করতে না পারায় এটিও কাল্পনিক নাম) ওপর। যার বয়স তখন ছয় বছর। সে কি ম্যাচ কাঠি বা লাইটার নিয়ে খেলছিল কি না। তবে পুলিশি সন্দেহ সবচেয়ে বেশি গিয়ে পড়ল তাদের মা টেরির (এই নামটা সঠিক) ওপর, যখন তাঁরা তিন বছর আগের একটি ঘটনার কথা জানতে পারলেন।’ এই পর্যন্ত বলে আজিজ ভাই বললেন, ‘আমাকে একটু রেস্টরুমে যেতে হবে, যদি কিছু মনে না করো।’ গল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে বিরতি কার বা ভালো লাগে? তবু তাঁকে বললাম, জি, অবশ্যই। তাঁকে গেস্ট টয়লেট দেখিয়ে দিলাম। যদিও তিনি ভালোভাবেই জানেন কোথায় সেটি। এর আগেও বহুবার তিনি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছেন। তিনি বাথরুমে গেলে আমি চোখের ইশারায় তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগছে? সে নিশ্বাস ফেলে বলল, ইন্টারেস্টিং। হেসে বললাম, সেটা তো সব সময়েই। তাঁর গল্প বোরিং হতেই পারে না। সে বলল, তুমি এমনভাবে বলছ, যেন এতে তোমার ক্রেডিট! তাঁর বলার ভঙ্গিটা আমার ভালো লাগল না। আমি অবাক হয়ে বললাম, আরে, আমি ক্রেডিট নিতে গেলাম কই? মহিলা মানুষের সঙ্গে দেখি কথা বলাটাও একটা যন্ত্রণা। সবকিছুতেই প্যাঁচ! সে বলল, এত অভিযোগ থাকলে কোনো পুরুষকেই বিয়ে করতে। থাকতে আমেরিকায়, ইচ্ছা করলেই সম্ভব ছিল। আমি গলা চড়িয়ে বললাম, ফালতু বাত মাত করো! সে উল্টো ধমক দিয়ে বলল, আস্তে কথা বল। মেহমানের সামনে সিনক্রিয়েট কোরো না। এই সময় বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার সোপ ডিস্পেন্সারটা আমার খুব ভালো লেগেছে। নাইস ওয়ান!’ আমি বললাম, থ্যাংক ইউ ভাই। তারপর কী হলো? ‘কতটুকু যেন বলেছিলাম?’ ওই যে, মহিলাকে আপনারা সন্দেহ করলেন। আজিজ ভাই বললেন, ‘ও হ্যাঁ, মহিলার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে গিয়ে আমাদের পুরো সন্দেহ গিয়ে পড়ল তাঁর ওপর। বাই দ্য ওয়ে, আমি আমরা বলতে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট বোঝাচ্ছি, আমি সেই কেসে ইনভলভড ছিলাম না। আমার ডিপার্টমেন্টও না। অন্য শহরের কেস হিস্ট্রি বলছি। শহরের নাম বা অন্য ডিটেইল শেয়ার করতে চাচ্ছি না।’ মূল ঘটনা হচ্ছে, গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পানি যখন অ্যাটিকে পুরোনো নগ্ন তার ভিজিয়ে দিচ্ছিল, তখন সেই ইলেকট্রিক্যাল তার স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) তৈরি করছিল। এতে কাঠের ওপর কার্বন ছাড়তে শুরু করে। কাঠ বিদ্যুৎ কুপরিবাহী হলেও কার্বন তড়িৎ পরিবাহী। ঘটনার রাতে ব্যক্তিগত কিছু কাজ করতে হবে বলে বাচ্চাদের ওপরে ঘুমাতে পাঠিয়ে মহিলা নিচে শুয়ে পড়েন। ঠান্ডা লাগছিল বলে স্পেস হিটার চালান। যে আউটলেট ব্যবহার করেন, সেটা কম ওয়াটের যন্ত্রপাতির জন্য ডিজাইন করা ছিল। তাই ১৫০০ ওয়াটের হিটার অন করায় তার গরম হয়ে যায়। কাঠে জমা কার্বনের কারণে আগুন ধরে এবং বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া কেমিক্যালবিহীন ইন্সুলেটরে আগুন ধরে যায়। সিরিজ অব ইভেন্ট বলে এটাকে। একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। আগুন ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। যশোহার রুমের ক্লজেটের ছাদের ওপরই ঘটনাটি ঘটে। আগুনে পুড়ে ছাদ ধসে নিচে পড়ে এবং তারপরই আগুন নিচ থেকে ওপরের দিকে উঠে ‘ঠ’ আকৃতি তৈরি করে। ইনভেস্টিগেটররা যার পুরো উল্টো রিপোর্ট দিয়েছিলেন। দীর্ঘ গল্প শুনিয়ে আজিজ ভাই দম নিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারপর? তিনি বললেন, ‘তারপর ওই মহিলা মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্তি পেল। আদালতে পুরো ঘটনার ডেমো দেওয়া হয়েছিল। জুরিদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তবে বেচারির জন্য আমার খুব খারাপ লাগে। দরিদ্র ছিল বলে নিজের এক বাচ্চাকে সে অ্যাডপশনে দিয়েছিল। তারপর চাকরি করে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, এমন সময়ে তাঁর বাচ্চা, বাড়ি সবই এক রাতে হারিয়ে গেল। আবার সম্মানে স্যালুটও দিই, একজন স্বল্প শিক্ষিতা, সাধারণ কিন্তু অসম্ভব বুদ্ধিমতী রমণী যা করে দেখাল, আমরা অনেক সাহসী মানুষও এমন পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দিতাম।’ আমি কিছু না বলে আমার বউয়ের দিকে তাকালাম। বউয়ের হাত তাঁর পেটে। আমাদের অনাগত সন্তান আছে সেখানে। এখনই মা তার মায়ায়, ভালোবাসায় পৃথিবীর যাবতীয় অনিষ্ঠতা থেকে তাকে ঢেকে রাখতে চাইছে। নশ্বর পৃথিবীতে কোনো কিছুই গ্রান্টেড হিসেবে নেওয়ার উপায় নেই। পুনশ্চ: সত্য ঘটনার ওপর আধারিত গল্প। মূল ঘটনায় সামান্য পরিবর্তন টেনে পাত্রপাত্রীর নাম গোপন রেখে লেখা হয়েছে। কেউ যদি আমেরিকান এই কেসটি সম্পর্কে কোথাও কিছু পড়ে থাকেন অথবা টিভিতে দেখে থাকেন, তাহলে বুঝে নেবেন সেই কেসটি নিয়েই লেখা।

শালুক ফুলের লাজ নাই !! Part- 06

আজাদ সাহেব বাসায় এলেন রাত ১১ টার দিকে।বাজারে তাদের তিন ভাইয়ের ১২ টা দোকান আছে,একজনের ৪ টা করে। এগুলো নিজেদের বাবার থেকে পাওয়া।তবে এরমধ্যে শালুকের বাবা ব্যবসায়ে লাভবান হয়ে আরো তিনখানা দোকান কিনেছেন। শালুকের ফুফু লিলির নামে ও আছে ৩ টি দোকান। শালুকের দাদা নুরুল ইসলাম যেমন বুদ্ধিমান তেমনি দূরদর্শী মানুষ হওয়ায় ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রচুর পরিমাণ জায়গাজমি কিনে রেখেছেন। বাজারের দোকান ছাড়া ও তার নিজের নামে এখনো দুইখানা ইটের ভাটা, স’মিল,জেলা শহরে চারটি গুদামঘর,তিনটি চালের আড়ত আছে।চরে নিজের প্রচুর জমি আছে যা বর্গা দেওয়া আছে।বছরে বছরে প্রচুর টাকা আসে সেখান থেকে। সব টাকা তিনি ব্যাংকে রেখেছেন। এসব টাকা কখনো সংসারে খরচ করেন না।ছেলেরা সবাই বিয়ে করার পর থেকেই ছেলেদের নামে বাজারের দোকান লিখে দিয়েছেন। ছেলেরা যাতে সংসারী হতে পারে,বাবার উপর নির্ভরশীল না হয়। আজাদ সাহেব বাসায় এসে জহিরকে দেখে খুশি হলেন। অনেক দিন পর ভাগ্নেকে দেখেছেন।লাজুক,মুখচোরা এই ছেলেটা সবসময় আড়ালে থাকে। ৩ ভাই,৩ জা,১ ননদ,শ্বশুর শাশুড়ীকে নিয়ে একটা মিটিং বসলো। মিটিং এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে আফিফার বিয়ের কথাবার্তা। চেয়ারম্যান সাহেবের ভাইয়ের ছেলে সজীব,জেলা সদরে তার নিজের দোকান আছে দুটো। একটা কাপড়ের দোকান অন্যটা কনফেকশনারি।ছেলের বায়োডাটা বের করে আজাদ সাহেব দেখালেন।ছেলে একটু খাটো শুধু।আফিফার উচ্চতা ৫.৫” সেখানে ছেলের উচ্চতা ৫.৪” এছাড়া ছেলের আর কোনো দিক দিয়ে কমতি নেই। লিলি বেগম বললেন, “ছেলের লেখাপড়া আছে তো ভাইজান?ছেলের টাকাপয়সা যাই থাক,লেখাপড়া হচ্ছে গিয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের। ” আজাদ সাহেব বললেন,”ছেলে বিএ পাস করছে লিলি।সবকিছু খবর নিছি আমি এক সপ্তাহ ধইরা।মা নাই সংসারে।বোন দুইটা বিয়ে দিয়ে দিছে।ছেলে ভাই একটাই।নির্ভেজাল সংসার। এখন কি করমু,ওদেরকে আসতে কমু?ওরা তো চিনাজোঁকের মতো লাইগা রইছে।ওদের কোনো দাবিদাওয়া নাই।ওরা শুধু মেয়েটারে চায়।” সেলিম সাহেব বললেন,”চেয়ারম্যান সাহেবরে তো চিনেন ভাইজান।যেই লোভী উনি তা এলাকার সবাই জানে।” আদিবা বেগম বললেন, “আহা মেজোমিয়া,এই দুনিয়ায় সব মানুষই চায় একটু বড় হইতে।সেইটারে লোভ বলা ঠিক না।” নুরুল ইসলাম সাহেব বুঝলেন তার ছেলে এবং ছেলের বউ মোটামুটি রাজি,সবার সাথে আলোচনা না করলে খারাপ দেখা যাবে বিধায় সবাইকে জানাচ্ছেন। গলা খাঁকারি দিয়ে তিনি বললেন,”সবার আগে আমার নাতনিরে ডাকো,ওর কোনো পছন্দ আছে কি-না জানন দরকার আগে।” আদিবা বেগম ধমকের সুরে বললেন,”কি বলেন আব্বা আপনি এসব।আফিফার আবার কিসের পছন্দ। আমরা যাই কমু তাই হইবো।এরকম মেয়ে আমি জন্ম দিই নাই যে অন্য ছেলের সাথে প্রেম ভালোবাসা করবে।আমার মেয়েরে আমি ভালো করেই চিনি।” লিলি বেগম মাথা নিচু করে ফেললেন।তিনি জানেন এই কথাটা নয়নাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। নয়না যে আদনানের জন্য বিয়ের আগে ভীষণ পাগলামি করেছে তার জন্য বড় ভাবী এই কথাটা বলেছে। আজাদ সাহেব বললেন, “আমি তাইলে ওদেরকে বলি আগামীকাল দুপুরে আসার জন্য? ” নুরুল ইসলাম সাহেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,”আরো একবার ভেবে দেখে সিদ্ধান্ত নাও।আরেকটু খোঁজ নাও।এখনকার যুগ এটা আর কিছু বলমু না।এরপরে ও যদি তোমরা মনে করো তোমাগো কোনো সমস্যা নাই তাইলে আল্লাহর উপর ভরসা করে ওদের আসতে বলো।” আদিবা বেগমের মুখ হাসি-হাসি হয়ে গেলো। এই প্রস্তাবটা তার ভীষণ মনে ধরেছে।সেই শুরু থেকেই তিনি চেয়েছেন এখানে মেয়ের বিয়ে দিতে।চেয়ারম্যান সাহেবের আত্মীয় হবে এটা কি চাট্টিখানি কথা! সবাই ঘুমাতে চলে গেলো। বিছানায় শুয়ে লিলি বেগম মেয়ের হাত ধরে বললেন, “এরকম কাজ করলি রে মা,এখনো খোঁটা শুনতে হয়।” নয়না জেগেই ছিলো, মেয়েকে খাওয়াচ্ছে।মায়ের কথা শুনে মুখটা মলিন হয়ে গেলো তার।বাহিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, নয়নার মনে হলো তার চোখের জল বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে বাহিরে। নিজের চোখ মুছে নয়না বললো, “দোষ কি আমার একার ছিলো মা?” লিলি জবাব দিলেন না।নাতনির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,”পুরুষ মানুষের দোষ কেউ-ই দেখে না মা।এই সমাজ এরকমই। পুরুষের বেলায় যেটা পাগলের মতো ভালোবাসা নারী করলে সেটা হয়ে যায় অসভ্যতা। ” নয়না মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বললো,”আমি ওসব ভুলে গেছি মা।নিধির বাবা ভীষণ ভালো মানুষ। আমার সব অনুভূতিকে সে সম্মান দেয়।আমার সব পাগলামি জেনেও সে আজ পর্যন্ত কখনো একটা প্রশ্ন ও করে নি। আমি খুব ভালো আছি মা।পুরনো ঘা তো,শুকাতে একটু সময় লাগছে আমার। বিশ্বাস করো মা,আদনান ভাইয়ের জন্য আমার মনে ভালোবাসার এক ফোঁটা অনুভূতি ও নেই।যা আছে তা শুধু ঘৃণা।” লিলি বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই শালুক দেখে বাড়িতে কেমন সাজ সাজ রব।শালুকের মন আনন্দে নেচে উঠলো। মন বলছে আজকে বাড়িতে একটা কিছু হতে চলেছে।তাহলে আজকে আর স্কুলে যেতে হবে না। স্কুলে না যাওয়ার আনন্দে শালুক কিছুক্ষণ দোতলার এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটে বেড়ালো।স্কুল মিস গেলেই শালুকের ইচ্ছে হয় পাখির মতো উড়তে।বারান্দায় দৌড়াতে অসুবিধা হচ্ছে দেখে শালুক ছুটে গেলো নিচের বাগানে। লাফাতে লাফাতে খেয়ালই করলো না ছাদের উপর থেকে এক জোড়া চোখ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। নাশতার টেবিলে বসে সবাই জানতে পারলো আজকে আফিফাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে।আফিফার মুখ শুকিয়ে গেলো এই কথা শুনে। মতির মা এক স্তুপ রুটি রাখতে রাখতে বললো, “আইজকে আমি বড় ভাইয়ের আনা নয়া শাড়িটা পিন্দুম।এরকম একটা খুশির খবর অনেক দিন পাই নাই।” আফিফা খাবার রেখে উঠে চলে গেলো নিজের রুমে। শালুক লাফিয়ে উঠলো শুনে।আপার বিয়ে হবে মানে বাড়িতে একটা উৎসব হবে।তারমানে অনেক দিন স্কুল মিস দেওয়া যাবে।সামনে যে প্রিটেস্ট এক্সাম আপাতত তাহলে সেসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে।এমনিতে ও এসব নিয়ে শালুক তেমন চিন্তা করে না।জীবনে বহুত পরীক্ষা আসবে যাবে, ফেইল হবে তাতে কি হয়েছে। সে যে পরীক্ষায় এটেন্ড করছে এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। শালুকের এই উড়ুউড়ু ভাব দেখে ধ্রুব গম্ভীরমুখে বললো, “ছোট চাচা,শাপলা,শালুকের তো সামনে প্রিটেস্ট মনে হয়। ওদের লেখাপড়ার কি অবস্থা? স্কুল কলেজে তো যায় বলে মনে হয় না একজন ও।” ফয়েজ আহমেদ চিন্তিত হয়ে বললেন,”আর বলিস না বাবা।শাপলার তো লেখাপড়া ভালোই চলে,এসএসসি তে ও তো ভালো করেছে,এবার ইন্টারেও ভালো করবে আশা করি। বিপাকে আছি আমার শালুককে নিয়ে। কোনোমতেই ওরে লেখাপড়ায় মনোযোগী করা যায় না।নিজে পড়ে না,কারো কাছে ও পড়ে না।টিউটর ও রাখতে পারি না।১ সপ্তাহ টিকে ওর সব টিচার।তারপর নিজ দায়িত্বে বিদায় নেয় ওনারা।আমার পরিবারের সবাই এতো ট্যালেন্ট অথচ এই মেয়েটা যে কেনো এমন হলো।আচ্ছা তুই তো অনেক দিন বাড়িতে আছিস,তুই একটু দেখ না ওর পড়াটা।” বাবার কথা শেষ হতেই শালুক যেনো ভিরমি খেলো। শাপলা বললো, “বাবা,আমার ও তো টিচার দরকার। ধ্রুব ভাই তাহলে আমাদের দুজনকে পড়াক।” ধ্রুব গম্ভীর হয়ে বললো, “আমার পক্ষে সম্ভব হবে না চাচা।তবে আপনি বললে আমি ওদের জন্য ভালো একজন টিচার ঠিক করে দিতে পারি। আমার এক ফ্রেন্ড আছে,আমরা ইন্টার পর্যন্ত একইসাথে পড়েছি।পলক ওর নাম।আপনি চিনবেন হয়তো, চেয়ারম্যান চাচার ছেলে ও।যদিও কাউকে পড়ায় না তবে আমি রিকুয়েস্ট করলে পড়াবে হয়তো। ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এখন,এলাকাতেই থাকে।” শালুকের মুখ বেদনায় নীল হয়ে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো এই পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় সে বুঝি। আদনান হাসতে হাসতে বললো, “এই গোবরের বস্তাকে পড়াবে পলক?পাগল হয়ে যাবে ও একে পড়াতে গেলে।চেয়ারম্যান চাচা নির্ঘাত মামলা করবে আমাদের সবার নামে তখন।” একটা হাসির রোল পড়ে গেলো আদনানের কথায়।লজ্জায়,অপমানে শালুকের চোখে পানি চলে এলো। কোনো কথা না বলে শালুক টেবিল থেকে উঠে চলে গেলো। ধ্রুব মাথানিচু করে খাচ্ছিলো, শালুককে উঠে যেতে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো শালুককে যতোক্ষণ পর্যন্ত দেখা গেলো।তারপর আদনান কে উদ্দেশ্য করে বললো, “শালুককে নিয়ে এই ধরনের কথা সবসময় বলবে না ভাইয়া।ও ছোট মানুষ, একটু বেশি চঞ্চল হয়তো। সবাই তো একরকম হয় না।যখন তখন ওকে এসব বললে ওর মন আরো খারাপ হয়ে যাবে।আমাদের উচিত ওকে উৎসাহ দেওয়া।এভাবে লজ্জা দেওয়া না।” আশা কফিতে চুমুক দিয়ে বললো, “ধ্রুব সঠিক কথা বলেছে।এভাবে ওকে নিয়ে মজা করা ঠিক না।” আদনানের কিছুটা গায়ে লাগলো আশা ধ্রুবকে সমর্থন করায়।কিছুটা অপমানিত ও বোধ করলো আদনান। ধ্রুবকে উদ্দেশ্য করে আদনান বললো,”ভূতের মুখে রাম নাম।তুই নিজেই বুঝি সাধুপুরুষ? তুই নিজেই তো শালুককে এসব বলতি আগে।এখন এতো ন্যাকামি করছিস যে হঠাৎ? ” ধ্রুব আগের মতো গম্ভীর গলায় বললো, “শালুক তখন ছোট ছিলো ভাইয়া,এখন ও ছোট নেই।আশা করছি তোমাকে আমার এক্সপ্লেইন করে বলতে হবে না টিনএজ ছেলেমেয়েদের সাথে আমাদের কিরকম বিহেভিয়ার করা উচিৎ। এই বয়সে যেটা শাসন দিয়ে হয় না সেটা ভালোবাসা দিয়ে করাতে হয়।” বাবা চাচা উঠে যেতেই আদনান কটাক্ষ করে বললো, “তো না করছে কে তোকে ধ্রুব,যা না।তুই গিয়ে শালুককে ভালোবাসা দিয়ে পড়ানো শুরু কর।দেখ গোবরে পদ্মফুল ফোটাতে পারিস কি-না! ” ধ্রুবর ভীষণ রাগ হলো আদনানের এরকম বেয়াদবের মতো কথা শুনে।সরাসরি আদনানের দিকে তাকিয়ে ধ্রুব বললো, “মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ ভাইয়া।স্থান, কাল,পাত্র বুঝে কথা বলার ম্যানার যদি ভুলে গিয়ে থাকো,তবে আমার কাছে এসো।আমি শিখিয়ে দিবো।মুখ থেকে যখন যা বের হয় তা বলেই নিজেকে খুব স্মার্ট ভেবো না।মনে রেখো,যেটাকে তুমি তোমার নিজের চোখে স্মার্টনেস হিসেবে দেখছো সেটাতে হয়তো সবার কাছে তোমাকে অভারস্মার্ট লাগতে পারে। নিজেকে এতোটাও হাসির পাত্র করো না।” রাগে আদনান কথাই বলতে পারলো না যেনো। ধ্রুব কি ঠান্ডা মাথায় তাকে অপমান করেছে? সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো সবাই মিটিমিটি হাসছে। ধ্রুব উঠে যেতেই আশা আদনানের দিকে তাকিয়ে বললো, “ধ্রুব ভুল কিছু বলে নি আদনান। মাঝেমাঝে তুমি ভীষণ অভারস্মার্ট হয়ে যাও,আমার নিজের কাছেই তা হাস্যকর লাগে তখন।ধ্রুব ভীষণ ম্যাচিউর পার্সন,ওর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে তোমার। ” আদনানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো এসব কথা শুনে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো, “আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না আশা।” কিছুক্ষণ পর সবাই ডাইনিং থেকে উঠে গেলে আফিফা দাদীর ঘরে যায়।সিতারা বেগম পান খাচ্ছেন জর্দা দিয়ে। জর্দার মাতাল করা ঘ্রাণে রুম ভরে গেছে।এই শোভা জর্দা সিতারা বেগমের প্রিয় জর্দা।সবাই ভুলে গেলেও ধ্রুব দাদীর এই প্রিয় বস্তুর কথা ভুলে না।যদিও তিন বেলা রুটিন করে জর্দা খাবার অপকারিতা ব্যাখ্যা করে দাদীকে।সিতারা বেগম অতি আগ্রহ নিয়ে নাতির সব কথা শুনে।যেখানে হ্যাঁ বলা দরকার সেখানে হ্যাঁ বলে, যেখানে না বলা দরকার সেখানে না বলে। নাতির সব কথায় সায় দিয়ে শেষে হেসে বলে, “দে ভাই আইজকা একটু খাই,বাঁচমু আর কতো দিন। মনের খায়েশ না মিটাইয়া মরতে চাই না।” আফিফাকে দেখে সিতারা বেগম হেসে বললেন,”বিয়ার কইন্যা আমার ঘরে যে হঠাৎ? কিলো বোইন,কি খবর? ডর লাগতাছে বুঝি?ডরের কিছু নাই বোইন।” আফিফা চেয়ারে বসে দাদীর দিকে তাকিয়ে বললো, “এই বিয়ে আমি করতে চাই না দাদী।আমি অন্য একজন কে পছন্দ করি।” সিতারা বেগম আঁতকে উঠলেন নাতনির কথা শুনে। ভয়ার্ত সুরে বললেন, “কারে?” আফিফা মাথানিচু করে বললো, “জহির ভাইকে। যদিও উনি জানেন না সেটা আমি কখনো ওনাকে বলতে পারি নি।তবে আমি ওনাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাই না দাদী।” সিতারা বেগমের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। নয়নার বিয়ের সময় এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে,চোখের সামনে সেসব ভেসে উঠলো। আদনানের জন্য নয়না ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলো,সেই সময় আদনানের মা লিলিকে চূড়ান্ত অপমান করলো। অথচ দোষ শুধু নয়নার ছিলো না সেটা সবাই জানতো। আজ আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে! কি করবেন সিতারা বেগম? মতির মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলো।তারপর মুহুর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই জেনে গেলো আফিফা জহিরকে পছন্দ করে। সবার হাসিখুশি মুখটি কালো হয়ে গেলো। তলে তলে এই মেয়ে এসব ভেবে রেখেছে জানতে পেরে আদিবা বেগমের প্রেশার হাই হয়ে গেলো। তিনি কিনা রাতেই এই মেয়েকে নিয়ে আরো বড় বড় কথা বলেছেন! আদনান তেড়ে গেলো আফিফার দিকে।ধ্রুব তাকে থামাতেই আদনানের রাগ আরো বেড়ে গেলো। ধ্রুবর কলার চেপে ধরে বললো, “আফিফা আমার বোন,তুই মধ্যখানে বাঁধা দেয়ার কে ধ্রুব?” আদনানের হাত থেকে নিজের শার্টের কলার সরিয়ে ধ্রুব বললো, “আফিফা তোমার যেমন বোন,তেমন আমার ও।ওর ভালো মন্দ তোমাকে যেমন স্পর্শ করে, তেমনি আমাদের ও করে। এভাবে রেগে গেলে সব সমাধান হবে না।সবকিছুতে রাগ হয়ে গেলে এক সময় দেখবে তোমার পাশে আর কেউ-ই নেই।” আজাদ সাহেব জহিরকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই জহির মাথা নিচু করে বললো, “আফিফার সাথে আমার এরকম কোনো সম্পর্ক নেই মামা।আমি এসব নিয়ে কখনো কিছু ভাবি নি।ও যদি এসব ভেবে থাকে তবে সেটা ওর একপাক্ষিক ব্যাপার। তবে আমি এরকম কোনো ব্যাপার ঘটুক তা চাই না।দরকার হলে আমি আজকের ট্রেনেই চলে যাবো।আপনারা আফিফাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন।” সব শুনে নয়নার বেশ ভালো লাগলো। বড় মামীর পাশে বসে নয়না ফিসফিস করে বললো, “মামী,এবার বুঝেছ তো কেমন লাগে?মেয়ের কষ্ট একদিকে দেখবে আর জ্বলবে।আমার মায়ের কষ্ট এবার বুঝবে।আমাকে নিয়ে সবসময় খোঁচা দিয়ে কথা বলো যে আমার মা’কে, এবার নিশ্চয় টের পাচ্ছো মায়েদের কেমন লাগে?” চলবে………

শালুক ফুলের লাজ নাই !! Part- 05

ধ্রুব ক্লান্ত,অবসন্ন দেহটাকে টেনে নিয়ে গেলো ছাদের ঘরে। যেই শঙ্কা ছিলো তার মনে, সেটাই সত্যি হলো। ড্রয়ার থেকে একটা এলবাম বের করলো ধ্রুব। এই এলবামে শুধু শালুকের ছবি,ছোট থেকে বড় পর্যন্ত। খুব যত্ন করে ধ্রুব সব জমিয়ে রেখেছে। মাঝেমাঝে ধ্রুব নিজেই অবাক হয় শালুকের প্রতি তার এই বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা দেখে। ধ্রুব নিজেকে সামলে রাখতে জানে,সেই সাথে সামলে রাখতে জানে নিজের মনের সব অনুভূতিকে। চেয়ারে বসে শালুকের ছবি দেখতে দেখতে ধ্রুবর চোখ গেলো দেয়ালের দিকে। মার্কার পেন দিয়ে লিখা, “আমি ধ্রুব,সবকিছুতে সিরিয়াস থাকি।সিরিয়াস থাকতে থাকতে আমার টয়লেট ও সিরিয়াস হয়ে গেছে। এজন্য আমার সহজে টয়লেট পায় না।” ধ্রুব প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলো এই লিখা পড়ে, পরমুহূর্তে ফিক করে হেসে ফেললো। বিড়বিড় করে বললো, “আমার বোকা ফুলটা জানে না তার এসব চালাকি সব আমার নখদর্পনে। ” শালুকের ছবির দিকে তাকিয়ে ধ্রুব বললো,”প্রিয় বোকা ফুল,তোমার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সব কিছু আমার ভীষণ চেনা,তেমনই ভীষণ চেনা তোমাকে।বাম হাতে এলোমেলো অক্ষরে এসব লিখলে কি আমি বুঝবো না বলো?তোমাকে এতো বেশি অনুভব করি যে মাঝেমাঝে আমি নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাই।বোকা ফুল,তুমি নিজেও তোমার নিজেকে এতো বেশি চেনো না যতোটা আমি তোমাকে চিনি।” শালুকের এই লেখা দেখে ধ্রুবর মন হঠাৎ করেই ভালো হয়ে গেলো। ছাদের ঘর থেকে বের হয়ে শালুকের রাজ্যের সামনে একমুহূর্ত দাঁড়ালো। শালুক লিখাটা একবার হাত দিয়ে ছুয়ে গুনগুন করে গাইতে লাগলো, “দূর হতে আমি তারে সাঁধিবো,গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।” নিচ তলায় এসে ধ্রুব তার ভোল পালটে ফেললো, হাসিখুশি মুখটি আবার গম্ভীর হয়ে গেলো। ধ্রুবর বাবা সেলিম সাহেব টিভিতে তখন নিউজ দেখছেন।ধ্রুব গিয়ে রিমোটটা নিয়ে চ্যানেল পালটে দিলো,স্পোর্টস চ্যানেলে দিয়ে খেলা দেখতে শুরু করলো। সেলিম সাহেব কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন নির্নিমেষ। কতো বছর হলো ধ্রুব তাকে বাবা বলে ডাকে না? ১০ বছর হয়ে গেছে। সেলিম সাহেব চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন আশেপাশে কেউ নেই।সবার সামনে তিনি ধ্রুবকে ডাকতেও লজ্জা পান।ছেলে যে জবাব দিবে না তা তিনি জানেন,তবুও তিনি ডাকেন সবার আড়ালে।ছেলে তার ডাকে সাড়া দেয় না,সবার আড়ালে ডাকলে রক্ষা একটাই তিনি কারো সামনে বিব্রত হন না। সাহস করে তাই ডাকলেন,”ধ্রুব…ধ্রুব….” ধ্রুব গান গাইতে লাগলো, “সময় গেলে সাধন হবে না….” দুই লাইন গেয়ে ধ্রুব হেডফোন কানে দিয়ে গান শুনতে লাগলো। সেলিম সাহেব মুগ্ধ হয়ে ছেলের গান শুনলেন।দীপালির মতো গানের গলা পেয়েছে ছেলে,দীপালি ও তো এরকম গান গাইতো।বলতে লজ্জা নেই,দীপালির গান শুনেই তো তিনি দীপালির প্রেমে পড়েছেন। আজ দীপালি তার কাছে শুধুই অতীত । সে স্বপ্ন হয়ে এসে দুঃস্বপ্ন হয়ে তার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে। কি এমন ক্ষতি হতো এই দুঃস্বপ্নটা যদি তার জীবনে আজীবন থেকে যেতো। তবুও তো তিনি ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে বাঁচতেন। সেলিম সাহেব উঠে যেতেই ধ্রুব কান থেকে হেডফোন খুলে ফেললো। বুক ছিড়ে যেই দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে চাইলো,তাকে ধ্রুব বাহিরে আসতে দিলো না।সযত্নে আবারও বুকের ভেতর মাটিচাপা দিয়ে দিলো। দোতলায় দাঁড়িয়ে শালুক দেখলো ধ্রুবর বেদনার্ত চেহারা। এক মুহুর্তের জন্য শালুকের মনে হলো, তার চাইতে বেশি কষ্ট নিয়ে কি ধ্রুব ভাই বেঁচে নেই,তবে সে কেনো এরকম কষ্ট পাচ্ছে! শালুক ভাবছে,তার যদি ম্যাজিক জানা থাকতো তবে ধ্রুব ভাইয়ের মনের সব কষ্ট ম্যাজিক করে দূর করে দিতো।ধ্রুব ভাইকে ছোট বেলার মতো প্রাণবন্ত করে দিতো।গোমড়া মুখখানা ঝামা পাথর দিয়ে ঘষে হাসিমুখ করে দিতো। আফসোস, তার কোনো ম্যাজিক জানা নেই।শালুক শাপলার রুমের দিকে গেলো। শাপলা চুল বাঁধছে বসে বসে।দুই ঠোঁট থেকে হাসি ফুরাচ্ছে না তার। শালুক বোনকে এতো খুশি দেখে বললো, “কি রে আপা,এতো খুশি যে তুই?” শাপলা কপট রাগ দেখিয়ে বললো, “এমনিতেই ভালো লাগছে খুব।” শালুক ফিসফিস করে বললো, “আপা একটা সিক্রেট বলি তোকে?তোর মন আরো ভালো হয়ে যাবে।” শাপলা মুখ বাঁকিয়ে বললো, “কোনো ইন্টারেস্ট নেই শোনার।” শালুক মুখ কালো করে বললো, “প্লিজ আপা শোন না,না বলতে পারলে আমার ভীষণ কষ্ট হবে।এই দেখ আমার পেট এখনই কেমন গুড়গুড় করছে।পেট ফেটে মরে যাব আমি নয়তো। মরে গেলে তোর বরের কি হবে বল?তোর বর অকালে শালিকা হারাবে।এই শোকে সে পাগল ও হয়ে যেতে পারে। তারপর ধর,তোর বাচ্চারা।ওরা খালামনির আদর পাবে না,ভাবতে পারিস কেমন মর্মান্তিক ঘটনা হবে এটা।খালা,খালা মানে বুঝিস তুই আপা?মায়ের বোন খালা,মায়ের চাইতে ভালা।আমি ওদের সেই খালা।আমি বেঁচে না থাকলে ওরা বিরাট বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। প্রতি ঈদে ওরা যেই সালামি পাবে,সেই সালামি তো ওরা খালাকে ভাগ দিতে পারবে না।ওদের চিপস,চকোলেট, জুস এসবে কেউ ভাগ বসাবে না।এই কষ্ট তোর বাচ্চারা ছোট থেকেই বুকে চাপা দিয়ে রাখবে। অবুঝ শিশুর বুকে কি যন্ত্রণার পাহাড়, কেউ বুঝে না সেটা! আহারে,আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নাদুস-নুদুস দুটো রসগোল্লা টাইপের বাচ্চা অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে,” না খালামনি,না।তুমি যেভাবেই হোক বেঁচে থাক।দরকার হলে আমাদের আম্মুর চুল টেনে ধরে জোর করে হলেও তোমার মনের কথা বলো।তবুও আমরা তোমাকে হারাতে পারবো না।আমাদের সব টাকা পয়সা জমা রাখার জন্য হলেও তোমাকে ভীষণ দরকার আমাদের। একা একা তো আমরা চিপস জুস খেতে পারবো না তোমাকে ছাড়া। আপা এই দেখ,আমার দুই চোখ ভিজে গেছে তোর মাসুম বাচ্চাদের আর্তনাদ শুনে।আর তুই পাষাণ মা হয়ে ও বাচ্চাদের মনের কথা বুঝলি না!” শাপলা বিস্ফোরিত নয়নে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, “তুই আমার বাচ্চাকাচ্চা পর্যন্ত চলে গেলি?বল,তোর অকাল মৃত্যু নিয়ে যখন আমার বাচ্চাদের ও এতো কষ্ট, ওদের মা হিসেবে আমি না হয় কথাটা শুনে তোর মনটা হালকা করি।” শালুক হেসে দিয়ে বললো, “তোকে এমন একটা নিউজ দিবো,শুধু তুই না যদি আমাদের বাসার নয়না আপার পুঁচকি মেয়েও শুনে যে এখনো কথা বলতে পারে না, সেও হতবাক হয়ে কথা বলে ফেলতে পারে।এরকম একটা কান্ড ঘটে গেছে। ” শাপলা বিরক্ত হয়ে বললো, “তো গিয়ে নিধিকে বল না।বেচারা এক সুযোগে কথা বলা শিখে যাবে।” শালুক ঠোঁট উলটে বললো, “আমি চাইলেই নিধিকে বলতে পারতাম,কিন্তু ভেবে দেখলাম ও এতো তাড়াতাড়ি কথা বলা শুরু করলে তো আবার সমস্যা। অকালপক্ব হয়ে যাবে। তাছাড়া প্রকৃতির নিয়ম এই শালুক লঙ্ঘন করে না।রুলস ইজ রুলস,সবার জন্য নিয়ম সমান।এই ভেবেই ওকে বলি নি।” শাপলা বিরক্ত হয়ে বললো, “বইন,তুই যা বলার ৩০ সেকেন্ডে বল,বলে বিদায় হ আমার রুম থেকে।” শালুক হতাশ হয়ে বললো, “প্যাঁচামুখোটা একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ” শাপলার বুজের ভেতর ধ্বক করে কেঁপে উঠলো। উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে এলো যেনো।জড়ানো স্বরে শালুককে জিজ্ঞেস করলো, “কার প্রেমে পড়েছে ধ্রুব ভাই?” শালুক ভ্রু নাচিয়ে বললো,”৩০ সেকেন্ড শেষ। আর কিছু বলবো না। ” শাপলা মিনতির স্বরে বললো, “বোন না,প্লিজ বল না।এখন তুই না বললে আমি মরে যাবো উত্তেজনায়। প্লিজ।আমি মরে গেলে আমার বাচ্চারা মা-হারা হবে,তুই কি তা হতে দিতি পারবি?” শালুক হেসে বললো, “অবশ্যই পারবো।তুই মরে যা,ওদের জন্য এই শালুক একলাই ১০০।ওরা তখন আমার কাছে থাকবে।তোকে ওদের এমনিতে ও খুব একটা পছন্দ না। মা হিসেবে তুই এমনিতেও খুব একটা সুবিধার না।” শাপলা ব্যাগ থেকে ১০০ টাকার একটা নোট শালুকের হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে বললো, “বল না লক্ষ্মী বোন আমার,আমার কুঁচুপুঁচু,টুনুমুনু তুই।” শালুক হেসে ফেললো শাপলার কথার ধরন দেখে।তারপর বললো, “আর ৫০ টাকা দে আপা।” শাপলা অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর ২০ টাকা দিয়ে বললো, “আর ৫০ টাকা আছে আমার কাছে।এরপর আমি একেবারে দেউলিয়া হয়ে যাবো।” শালুক বললো, “আচ্ছা থাক তাহলে। ধ্রুব ভাইয়ের ব্যাগে আমি দেখেছি একটা শপিং ব্যাগে কতোগুলো হেয়ার ব্যান্ড, অনেক সুন্দর জানিস আপা।তারপর চুলের গাজরা।আবার লিখা ছিলো আমার কেশবতীর জন্য।আমি একটু আগে ধ্রুব ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই উনি হেসে বললো, উনি একজনকে ভীষণ ভালোবাসেন,সেই তার কেশবতী।” শাপলার আনন্দিত চেহারায় রাজ্যের বিষাদ নেমে এলো। শালুককে সেসব বুঝতে না দিয়ে বললো, “আচ্ছা যা এখান থেকে এবার।” শালুক উঠতে যেতেই মতির মা এসে ব্যস্ত হয়ে বললো, “ও আল্লাহ,আপনেরা এইখানে বইসা রইছেন।নিচে তো জহির ভাইজান আইসা হাজির।বড় আম্মায় সবাইরে ডাকে।” শাপলা, শালুক দুই বোনেই নিচতলার দিকে গেলো। আশা তার সাদা টি-শার্টটা পরে নিচে নামতেই দেখলো সবাই মিটিমিটি হাসছে তাকে নিয়ে।নয়না তার মেয়েকে কবিতা আবৃতি করে শোনাচ্ছে, “হার্দিকা, ফার্দিকা,দেখলে মনে হয় চামচিকা। আশা,পাশা কাকের বাসা,মাথায় তার আবর্জনায় ঠাঁসা। ” আশা চমকে উঠলো এসব শুনে।আদনান এগিয়ে গিয়ে টি-শার্ট এর পিছনে এসব লিখা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো। তারস্বরে চেঁচিয়ে বললো, “রাবিশ,এসব কে লিখেছে আশার টিশার্টে? ” কেউ কোনো জবাব দিলো না। ধ্রুব আপেলে কামড় দিতে দিতে এগিয়ে এসে আশার টিশার্টের কবিতাটা পড়লো। তার ভীষণ হাসি পেলো, হাসি সামলে রেখে গম্ভীরমুখে বললো,”ছাদের রুমের দেয়ালেও কে কি সব হাবিজাবি লিখে রেখেছে ভাইয়া।দুই জনের লিখাই তো সেইম মনে হচ্ছে। সবার হাতের লিখা পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কালপ্রিট এখানেই আছে।” শালুকের ভীষণ হাসি পেলো এই কথা শুনে। মনে মনে বললো, “এই শালুককে ধরা এতো সহজ না।শালুকের মাথায় বুদ্ধি কিলবিল করে বুঝলি।আমার বাম হাতের ছড়িয়ে ছিটিয়ে লিখা চেনার সাধ্য তোর মতো প্যাঁচামুখোর নেই।” বাবা এবং সৎ মায়ের সাথে কথা না বললেও ভাই বোনদের সাথে ধ্রুবর ভীষণ ভালো বন্ডিং। ছোট ভাই দিব্যকে বললো, “ছুটে গিয়ে কাগজ কলম নিয়ে আয়।” ভাইয়ের আদেশ শুনে দিব্য ছুটে গেলো। তারপর কাগজ কলম এনে একে একে সবার লিখা পরীক্ষা করা হলো।ধ্রুব গম্ভীরমুখে বললো, “না,কারো লিখার সাথেই ম্যাচ করছে না।” আদনান চিন্তিত হয়ে বললো,”আফিফার কাছে যে বাচ্চারা পড়তে আসে ওদের মধ্যে কেউ হতে পারে। ” ধ্রুব মাথা নেড়ে বললো, “হতে পারে। ” শালুক মনে মনে বললো, “বড় গাধা আর ছোট গাধা,দুই গাধা আজীবন তপস্যা করলেও শালুকের মতো ট্যালেন্ট হতে পারবি না।শালুককে ধরা তোদের কাজ নয়।” ধ্রুব শালুকের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, “মনের বাগানে ফোটা একটা বোকা ফুল,হাসলে তাকে ভীষণ মিষ্টি লাগে।” চলবে……

শালুক ফুলের লাজ নাই !! Part- 04

ধ্রুব পকেট থেকে একটা মাউথ অর্গান নিয়ে বাজাতে বসলো। নীল রঙের এই মাউথ অর্গান ছিলো ধ্রুবর বাবা-মা থেকে পাওয়া শেষ উপহার। যখনই ধ্রুবর কষ্ট হয় ভীষণ, ধ্রুব এই মাউথ অর্গান বাজায়।মা’ই তো তাকে শিখিয়েছিলো মাউথ অর্গান বাজাতে। মায়ের কথা ভাবতেই ধ্রুবর কেমন বুক চিনচিন করে ব্যথা হয়।মা’য়ের চেহারা ও সে প্রায় ভুলতে বসেছে। আজকে দেখে আবারও মনে পড়লো। আচ্ছা, একটা জীবন তপস্যা করলেও কি ধ্রুব আর বাবা-মা কে এক বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারবে? শালুক রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলো ভেতর থেকে একটা খুব সুন্দর সুর ভেসে আসছে। শালুকের বুঝতে দেরি হলো না এটা কিসের সুর,আর কেনো বাজছে।এই বাসার সবাই জানে ধ্রুবর যখন অতিরিক্ত মন খারাপ হয় তখন সে মাউথ অর্গান বাজায়।সেই সময় কেউ-ই তাকে ডিস্টার্ব করে না। মনে মনে এতোক্ষণ ধ্রুবকে যেসব অভিশাপ দিয়েছে তা ফিরিয়ে নিয়ে আল্লাহকে বললো,”আল্লাহ,ধ্রুব ভাইয়ের যাতে কিছু না হয়।ওনার পেট খারাপ যাতে না করে কিছুতেই।এমনিতেই তার মন খারাপ।” দরজায় নক হতেই ধ্রুব উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। শালুক নাশতার ট্রে বিছানার উপর রেখে বললো, “আপনার নাশতা। ” ধ্রুব এক ঝলক তাকিয়ে বললো, “হাত কেটে গেছে,খাইয়ে দিতে পারলে খাইয়ে দে।নয়তো ট্রে নিয়ে বিদায় হ সামনে থেকে। ” শালুক কিছুক্ষণ ভাবলো কি করবে,তারপর উঠে চলে গেলো। ধ্রুব হাতের দিকে তাকালো। রক্ত হাতেই শুকিয়ে গেছে। ধ্রুব মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বললো, “এই হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার তুলনায় এই রক্ত কিছুই না।হৃদয়ের রক্তক্ষরণ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারলে এই সামান্য হাতের কাটাকে কেনো ভয় পাচ্ছি?” হাসনা বেগম রুমে আসতে আসতে বললেন,”হাত না-কি কে/টে ফেলেছিস ধ্রুব? শালুক গিয়ে না বললে তো জানতামই না।কি কান্ড বল তো দেখি?” ধ্রুব হাসলো। এই একটা মানুষ শুধু তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে ছোট বেলা থেকে। সবার থেকে ধ্রুব অবহেলা পেয়েছে, এই মানুষটার থেকে পেয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা। হাসনা পরোটা ছিড়ে নিয়ে মাংস দিয়ে ধ্রুবর মুখে পুরে দিয়ে বললেন,”ধ্রুব,এভাবে আর কতোদিন বাবা?বাড়ির ছেলে বাড়িতে ফিরে আয় না।কি যে হলো তোর হুট করে। খোকাও আমেরিকা চলে গেলো, তুই ও তার এক সপ্তাহ পর চলে গেলি।বাড়িটা কেমন খাঁখাঁ করে বাবা।জহির ও আসে চট্টগ্রাম থেকে। তোর ফুফু ছেলের জন্য কি যে হাপিত্যেশ করে মরে,অথচ ছেলেটা আসতেই চায় না।আমরা কি ওর পর কেউ?এই বাড়িতে কি ওর মায়ের ভাগ নেই?তবে কেনো ছেলেটা এতো লজ্জা পায় বল তো?” ধ্রুব খেতে খেতে বললো, “আমি গতরাতে কল দিয়েছিলাম,আমাকে তো বললো আজকে বিকেলের ট্রেনে ভাইয়া ও আসবে।তবে কাউকে বলতে নিষেধ করেছে।মনে হয় ফুফুকে সারপ্রাইজ দিবে চাচী।তুমি কিছু বলো না কাউকে।” হাসনা উৎফুল্ল হলেন শুনে।দুচোখ আনন্দে চকচক করে উঠলো। ধ্রুবকে সবটা খাইয়ে বের হয়ে গেলেন হাসনা। শালুকের বড় চাচী আদিবা পাকা কলা,ডিম,এলোভেরা জেল মিশিয়ে কি একটা হেয়ার প্যাক বানিয়ে শালুককে ডাকছে।শালুক একটা হিজাব নিয়ে হিজাব পিন দিয়ে ভালো করে হিজাব বেঁধে নিচে নামলো। আদিবা চেয়ারে বসলেন,সামনে একটা মোড়া রাখা।শালুকের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো,এক দৌড়ে নিজের রুমে যেতে নিতেই ধ্রুবর সাথে ধাক্কা লাগলো। বিরক্ত হয়ে ধ্রুব বললো, “ষাঁড়ের মতো ছুটছিস কেনো?” নিচ থেকে আদিবা বেগমের ডাক শোনা গেলো আবারও। ধ্রুব জিজ্ঞেস করলো, “বড় চাচী ডাকছে যে কানে যায় না?ওদিকে না গিয়ে রুমের দিকে যাচ্ছিস কেনো?” শালুক চুপ করে রইলো।কোনোমতে এখন ঝগড়া করা যাবে না।ধ্রুব যদি কোনো মতে জানতে পারে শালুকের চুল নেই তবে আজ শালুকের কপালে শনি আছে। মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলো। আল্লাহকে বললো, “ইউনুস নবীকে তুমি মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছো আল্লাহ,আমাকে ও আজকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো।” শালুককে চুপ থাকতে দেখে ধ্রুবর সন্দেহ হলো। শালুক তো মৌনব্রত করার মেয়ে নয়।তবে সে চুপ করে আছে কেনো।শালুকের হাত ধরে টেনে ধ্রুব নিচের তলার দিকে নামাতে লাগলো। শালুক গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। আদিবা বেগম শালুকের হিজাব খুলতে যেতেই আরেকটা যুদ্ধ বাঁধলো।শালুক কিছুতেই তার হিজাব খুলতে দিবে না।আদিবা বেগম মেয়ের সাথে না পেরে ধ্রুবর দিকে তাকালেন।ধ্রুব এগিয়ে এসে শালুকের দুই হাত চেপে ধরে বললো, “আপনি ওর হিজাব খোলেন চাচী।” হিজাব সরাতেই আদিবা বেগম চিৎকার করে উঠলেন।ধ্রুব কিছু বুঝতে পারলো না। শালুকের পিছনে গিয়ে ওর চুল দেখে ধ্রুব নিজেও চিৎকার করে উঠলো। মুহুর্তেই সারা বাড়ি জেনে গেলো শালুকের কোমর সমান চুল শালুক কেটে ফেলেছে। মাথা নিচু করে শালুক দাঁড়িয়ে আছে। একটা মানুষের চুল নিয়ে সারা বাড়ির সবার এতো মাথা ব্যথা হবে কেনো শালুক এই হিসেব কিছুতেই মিলাতে পারছে না। মুহুর্তেই নিচতলার চেহারা বদলে গেলো যেনো দরবার বসেছে,দাদা দাদী থেকে শুরু করে নয়না আপার পিচ্চি মেয়ে নিধি পর্যন্ত সেই বিচারসভায় হাজির হলো। সবার এক প্রশ্ন,কেনো শালুক চুল কে/টে ফেলেছে? শালুক ভেবে পেলো না কি জবাব দিবে!সে কি বলবে আদনান ভাই ফার্দিকাকে বিয়ে করবে,এই দুঃখে,কষ্টে সে চুল কে/টে ফেলেছে? এই কথা শালুক জীবনে ও বলতে পারবে না। ধ্রুব অস্থির হয়ে পায়চারি করছে।রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে।সে কি-না এই বেকুব, গাধা মেয়েটার জন্য হেয়ার ব্যান্ড, গাজরা নিয়ে এসেছিলো!আর এদিকে সে টাক্কু হয়ে বসে আছে? শালুকের মনে হলো, প্রতিবার পরীক্ষায় ফেইল করার পরেও এরকম দক্ষযজ্ঞ বাঁধে নি এবার এরা সামান্য চুল নিয়ে যা করছে। মিনমিন করে শালুক বললো,”লম্বা চুলে গরম বেশি লাগে,তাই আমি কে/টে ফেলেছি।” আদিবা বেগম হুঙ্কার দিয়ে বললেন,”গরম লাগে,তোর একার গরম লাগে এই দুনিয়ায়?আর কারো গরম নেই?তোর এতো গরম লাগলে আমাকে বলতি।আমি তোর চাচাকে বলে তোর ঘরে এসি লাগিয়ে দিতাম।তুই কোন সাহসে চুলে হাত লাগালি?” শালুকের মেজো চাচী দূরে দাঁড়িয়ে প্যাচপ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,”কতো যত্ন করে তোর চুল এতো বড় করছি আমরা।রাত জেগে ইউটিউবে গতকাল রাতেও একটা হেয়ার স্টাইল শিখেছি। অথচ তুই কি-না সব আশায় পানি ঢেলে দিলি?” আদনান হাসতে হাসতে বললো, “লজ্জায় কে/টে ফেলেছে মা,গিয়ে দেখো কোনো পরীক্ষায় ও আন্ডা পেয়েছে। তাই এই কাজ করেছে।” ধ্রুব রেগে গেলো আদনানের এই কথা শুনে। হাত মুষ্টি করে নিজেকে সামলালো। আশা বললো, “শর্ট হেয়ারেও শালুককে কিউট লাগছে আন্টি।ওর জন্য শর্ট হেয়ারই বেস্ট। ” আদনানের বোন আফিফা ধমকে উঠলো আশাকে।চোখ রাঙিয়ে বললো, “তুমি চুপ করো আশা,তুমি এসব বুঝবে না।আমাদের শালুকের চুল আমাদের পরিবারের সবার কাছে একটা ভালোবাসা। তুমি ওসব বুঝবে না।” হাজার জিজ্ঞাসাবাদের পরেও শালুকের মুখ থেকে কেউ কথা বের করতে পারলো না যখন তখন শালুকের দাদা ধ্রুবকে বললেন,”তোর উপর দায়িত্ব রইলো এই রহস্য উদঘাটনের।” আদনান হেসেই যাচ্ছে বারবার শালুকের চুলের এই অবস্থা দেখে। শালুককে এই মুহূর্তে ভীষণ রোগা লাগছে।প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে শালুক যেই কষ্ট পেয়েছে এখন বুঝতে পারছে তার চাইতে হাজার গুণ বেশি কষ্ট তার জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ ভেবে শালুক সিদ্ধান্ত নিলো ধ্রুব ভাইকে সে সত্যি কথা বলে দিবে।তা না হলে ধ্রুব যে সহজে শালুককে নিস্তার দেবে না তা শালুকের চাইতে ভালো আর কে জানে? সন্ধ্যা হতেই শালুক আজ বই নিয়ে বসে গেলো। আজ পড়া নিয়ে কোনো অবহেলা চলবে না।কেননা আজকে শালুকের সামান্য একটু দোষ পেলেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে শালুকের উপর। এক মগ ধূমায়িত কফি নিয়ে ধ্রুব এলো শালুকের রুমে।শালুককে পড়তে দেখে ধ্রুব মনে মনে হাসলো। বিছানার উপর দুই পা ভাঁজ করে বসে বললো, “নে এবার ঝেড়ে কাঁশ তো শালুক।কোনো হাংকিপাংকি আমার সাথে করবি না। ” শালুক মাথা নিচু করে বললো, ” আমি সরি ধ্রুব ভাই। আমার আসলে মাথার ঠিক ছিলো না। প্রচন্ড রাগে আমি এরকম করে ফেলেছি হুট করে। ” ধ্রুব ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “রাগের কারন কি?” শালুকের দুই চোখ জলে টইটম্বুর হয়ে গেলো মুহূর্তেই।একটু হাওয়া দিলেই কচু পাতার জলের মতো টুপ করে পড়ে যাবে। যন্ত্রণারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আরো একবার। নেই,নেই,আদনান ভাই আর শালুকের নেই।চিৎকার করে শালুকের এই কথা বলতে ইচ্ছে করলো। তবুও আস্তে করে বললো, “আদনান ভাই আমাকে এভাবে ঠকালো কেনো? আমি কি দোষ করেছি?উনি তো আমাকে ভালোবাসতেন তবে কেনো এখন রূপ পাল্টালেন বলেন? আমি তো এক বুক আশা নিয়ে আদনান ভাইয়ের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম।অথচ উনি ফিরে এলেন সাথে হবু বউ নিয়ে। আমার তখন মাথা ঠিক ছিলো না আর।নিজেকে মনে হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায়। কাউকে কিছু বলতে পারি নি আমি।তাই রাগের মাথায় এরকম করে ফেলেছি। ” ধ্রুব যেনো হতভম্ব হয়ে গেলো শালুকের এসব কথা শুনে।মাথার ভেতর আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তার রাগ।নিজেকে সংযত করে অবাক দৃষ্টিতে শালুকের দিকে তাকিয়ে বললো, “আদনান ভাই তোকে কখনো ভালোবাসি বলেছে শালুক?” শালুক চমকে গেলো এই প্রশ্ন শুনে। আদনান ভাই তো তাকে কখনো এরকম কিছু বলে নি। মাথা নেড়ে বললো, “না,বলে নি।” ধ্রুব জিজ্ঞেস করলো, “তোকে কখনো বলেছেন উনি যে তোকে ছাড়া বাঁচবে না,তোকে না পেলে মরে যাবে।সিনেমায় দেখিস না নায়কেরা যেরকম বলে নায়িকাদের? ” শালুক কিছুক্ষণ ভাবলো। আদনান ভাই তাকে বউ বলে ডাকতো ঠিকই তবে এরকম কথা তো কখনো বলেন নি। আবারও মাথা নেড়ে শালুক বললো, “না বলেন নি কখনো। ” ধ্রুব যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তারপর বললো, “তাহলে তুই কোন দিক থেকে ভেবে নিলি উনি তোকে ভালোবাসেন?” শালুক উত্তর দিতে পারলো না সহসা।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তাহলে কেনো উনি আমাকে বউ বলতেন?কেনো বলতেন তার ভবিষ্যৎ বাচ্চার আম্মু।দেশে আসার আগেও তো যখন আমার সাথে কথা হয়েছিলো,আমাকে বলেছিলেন যে আমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। এসব কি পজিটিভ সাইন নয়?ভালো যদি না বাসেন তবে কেনো এসব বলতেন?” ধ্রুব নিশ্বাস ফেলে বললো,”,আদনান ভাই এরকমই। ছোট বেলা থেকেই উনি তোকে এভাবে বলতেন।তোর বয়স কম,আবেগ বেশি। তুই টিন-এজ মেয়ে,এটা ওনার মাথায় রাখা উচিত ছিলো। হয়তো উনি কিছুটা মজা নিতে চেয়েছেন তোর সাথে। কিছু মানুষ থাকে যারা মেয়েদের সাথে এসব মজা নিয়ে আনন্দ পায়।ব্যাপারটা যেভাবেই হোক উনি তোর সাথে এভাবে কথা বলায় তুই ব্যাপারটা অনেক দূর পর্যন্ত ভেবে ফেলেছিস।এখানে আসলে দোষ তোর নয় শালুক।তোর এজটাই এরকম।কেউ একটু ইমোশনাল কথা বললে এই বয়সী মেয়েরা তখন নানারকম স্বপ্ন দেখতে থাকে।এজন্য বিপরীত মানুষটার উচিত এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া।তার একটু ভুলে এরকম অনেক মেয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলে।তুই আসলে যেটাকে ভালোবাসা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস সেটা কোনো ভালোবাসা নয়।এটাও একটা আবেগ তোর। তোর ব্যাপারটা আসলে হচ্ছে তোর অবচেতন মন আদনান ভাইকে পছন্দ করে, সেই ভালো লাগাকে তুই ভালোবাসা ভেবে বসে আছিস। প্রিয় নায়কের প্রেমের কথা,বিয়ের কথা শুনলে মানুষ যেমন কিছু সময়ের জন্য কষ্ট পায়,তুই ও তাই পাচ্ছিস শুধু।আদনান ভাই তোর শুধুমাত্র পছন্দের একজন মানুষ এর বেশি কিছু না। আদনান ভাইকে যদি তুই সত্যি ভালোবাসতি তবে তার সামনে এভাবে ঠিক থাকতে পারতি না।হার্দিকাকে দেখেও এভাবে চুপ থাকতে পারতি না।ভালোবাসা হলে প্রিয় মানুষের পাশে অন্য কাউকে সহ্য করা যায় না শালুক।এই যে আজ দুদিন হয়ে গেলো, তুই কি একবারও আদনান ভাইকে দেখে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলতে পেরেছিস,তুই তাকে ভীষণ ভালোবাসিস? পারিস নি তো। আমি তোকে বকবো না আজ।কাউকে কিছু বলবো না। আজ তোকে পড়তে হবে না।তুই নিজেই ঠান্ডা মাথায় বসে ভেবে দেখ,এটা তোর সত্যিকার ভালোবাসা না-কি একতরফা ভালো লাগা। আর সারপ্রাইজের কথা বলছিস,এই যে আমাদের জন্য ভাবী নিয়ে এসেছে এটাই তো সারপ্রাইজ!” ধ্রুব উঠে চলে গেলো শালুকের রুম থেকে। তারপর থেকে শালুক ভাবতে লাগলো।ভেবে দেখলো আসলেই তো ধ্রুব ভাই ঠিক বলেছে।সে তো এভাবে ভেবে দেখে নি। নিজের ভাবনা ভাবতে গিয়ে শালুকের মোটা মাথায় অন্য একটা ভাবনা এলো। ধ্রুব ভাই এসব ব্যাপারে এতো কিছু কিভাবে জানলো? ধ্রুবর রুমে গিয়ে শালুক জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এতো কথা কিভাবে জানো ধ্রুব ভাই? তুমি ও কি কাউকে ভালোবাসো না-কি? ” ধ্রুব চোখ লাল বড় করে তাকাতেই শালুক ভেংচি দিয়ে বললো, “আমি কিন্তু সব জানি,দেখেছি ও।কোন কেশবতীর জন্য যে গিফট এনেছো সব আমি দেখেছি। ” ধ্রুব হেসে উঠে বললো, “ঠিকই জানিস।আমার ও একটা কেশবতী আছে।যাকে আমি ভীষণ রকম ভালোবাসি। এবার ভাগ এখান থেকে। ” চলবে…… রাজিয়া রহমান

শালুক ফুলের লাজ নাই !! Part- 03

শালুক আজকে নিজের রুমেই ঘুমাবে,শাপলার সাথে ঘুমাতে গেলে তার চুল কেটে ফেলার খবরটা জানাজানি হয়ে যেতে এক মুহুর্ত ও সময় লাগবে না।সবচেয়ে বড় কথা শালুককে নিয়ে একটা ছোট খাটো দরবার বসবে।বাড়িতে মেয়েদের মধ্যে শুধুমাত্র শালুকের চুলই ঘন,লম্বা,সিল্কি।অন্যদের চুল কোঁকড়ানো অথবা ছোট অথবা পাতলা।এজন্য শালুকের চুলে শালুক নিজেই হাত দিতে পারে না। শালুকের মনে হয় চুলগুলো শুধু তার মাথায় রয়েছে,এমনিতে এই চুলের মালিক এই বাড়ির সবাই। বড় চাচী,মেজো চাচী সপ্তাহে দুই তিন দিন ধরে চুলে বিভিন্ন হেয়ার প্যাক লাগিয়ে দেয় শালুককে। নিজের রুমের দরজা লাগাতেই শাপলা এসে দরজায় দুমদাম ধাক্কাতে লাগলো। শালুক সবেমাত্র মাথা থেকে ওড়না সরিয়েছে,দরজায় দুপদাপ শুনে আবারও ওড়না ভালো করে মাথায় পেঁচিয়ে শালুক উঠে গিয়ে দরজা খুললো। ফ্যাকাসে মুখে শাপলা দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। শালুক জিজ্ঞেস করার আগে শাপলাই বললো,”আদুর বিদেশিনী আমার রুমে এসে হাজির,আমার সাথে ঘুমাবে না-কি!আমার কেমন জানি লাগতেছে শালুক।তুই ও আয় আমার রুমে। এমনিতেই তো তুই একা ঘুমাতে পারিস না আজ কি মনে করে নিজের রুমে এলি।” শালুক একটু ভাব নিয়ে বললো,”আমি কি আজীবন ছোট-ই থাকবো না-কি? একা ঘুমানোর অভ্যাস করছি।আর তোর রুমে তিনজন মিলে গাদাগাদি করে ঘুমাতে পারবো না আপা।ফার্দিকারে দেখলে কখন কি করে ফেলি আমার মাথার ঠিক নেই।আমি কসম করেছি এটা নিয়ে। ” শাপলা চোখ গোল করে জিজ্ঞেস করলো, “কিসের কসম?” শালুক মাথা নেড়ে বলে, “এই দুই তলার কসম,একদিন চরম প্রতিশোধ নিবো।ওই আদনান তার ফার্দিকাকে কি বলেছে জানিস,আমার না-কি ঘুমের ঘোরে হাটার অভ্যাস,মানুষের গলা টিপে ধরার অভ্যাস,তাই আমার সাথে যাতে না ঘুমায়।তখনই আমি কসম করেছি,যদি না করি তবে এই দুইতলা ভূমিকম্পে ভেঙে খানখান হয়ে যাবে আদনাইন্না আর ওর পিরিতির ফার্দিকাকে নিয়ে।” শাপলা বোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, “তুই থাকবি কোথায় তখন?” শালুক ফিক করে হেসে বললো, “আমাকে এতো বোকা ভেবেছিস আপা?আমি কি সেটা না ভেবেই কসম করেছি না-কি? আমি ছাদে আমার চিলেকোঠার ঘরে থাকবো।ভেঙ্গে গেলে দুইতলা যাবে,ওটা তো ভাঙ্গবে না।ওটার কসম তো করি নি।” শাপলা হতাশ হয়ে বললো, “তুই যদি জানতি শালুক তুই কি পরিমাণ বোকা,তবে এই কসম করতি না।” শালুক রেগে গিয়ে বললো, “যা ভাগ এখান থেকে। আসছে আমার বুদ্ধিজীবি। ” শাপলা হতাশ হয়ে চলে গেলো নিজের রুমের দিকে। দরজা বন্ধ করে শালুক বিছানায় পিঠ লাগাতেই রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করলো শালুককে।নিজেকে কেমন নিস্তেজ,নিষ্প্রাণ লাগছে শালুকের কাছে।একটা মানুষের প্রতারণায় শালুক এভাবে গুড়িয়ে যাবে কখনো কি ভেবেছে সে? অসাড় হয়ে যাওয়া দেহটা যখন ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করছে সেই মুহুর্তে শালুকের মাথায় আসলো সে আসলেই বোকা। তা না হলে সে কিভাবে বড় চাচীর কাছে গিয়েছিলো তখন চুল বাঁধার জন্য?কেউ যাতে ওর চুল কেটে ফেলার ব্যাপারটা ধরতে না পারে তার জন্য ঘোমটা দিয়ে রাখছে সকাল থেকে। একা ঘুমাতে ভয় পাওয়ার পরেও নিজের রুমে একা ঘুমাতে এসেছে। অথচ সে কি-না এক মুহুর্তে ভুলে গেছে মাথার চুলের কথা। নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করলো শালুক,”কবে তোর মাথায় বুদ্ধি হবে শালুক?” জবাব এলো না। ঘুমাতে গিয়ে শালুকের হঠাৎ করেই মনে হলো জানালার ওপাশে কে যেনো দাঁড়িয়ে আছে। আড়চোখে শালুক সেদিকে তাকাতেই যেনো কিছু একটা সরে গেলো। ভয়ে আতঙ্কে জমে গেলো শালুক। একা ঘুমাতে গেলেই শালুকের এরকম হয়।সবসময় মনে হয় কেউ একজন আছে, তাকে আড়াল থেকে দেখছে। হঠাৎ করেই শালুক যেনো নিশ্বাস ফেলার শব্দ ফেলো বিছানার নিচে থেকে। পায়ের কাছ থেকে কাঁথা টেনে নিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো শালুক।মনে মনে একদমে আয়াতুল কুরসি পড়ে যাচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি নিয়ে সকাল শুরু হলো। জানালার গ্লাসে বৃষ্টির ঝাপটা এসে বারবার আঘাত হানছে।শালুক চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে চারদিক কেমন অন্ধকার হয়ে আছে।হতভম্ব হয়ে গেলো শালুক! এক ঘুমে সে এক রাত এক দিন কাটিয়ে ফেলেছে! এমন ঘুম ঘুমিয়েছে যে সন্ধ্যা নেমে গেছে অথচ শালুক টের পায় নি। অবাক হলো শালুক আবার কিছুটা। কেউ তাকে ডাকলো না কেনো?বিশেষ করে ধ্রুব ভাই বাড়িতে আসার সাথে সাথেই তো মা গলাটাকে একটা ছোটখাটো হ্যান্ডমাইকের রূপ দিয়ে সবার কান ফাটিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে। যেনো ধ্রুব কোনো দেশের প্রাইম মিনিস্টার, তাকে দেখতে যেতেই হবে সবার। আজ এরকম করলো না কেনো তবে মা? নাকি তাও শালুকের কানে যায় নি! ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে শালুক পা টিপে টিপে বের হলো রুম থেকে। তারপর শাপলার রুমে গিয়ে বললো, “আপা, আমাকে কেউ ডাকে নি কেনো?সন্ধ্যা হয়ে গেছে অথচ কেউ একবার ডাকলো না।আমি যদি মরে যেতাম তবে কেউ জানতি ও না তোরা।” শাপলা বিরক্ত হয়ে বললো, “কানের কাছ থেকে যা তো শালুক,গাধার মতো কথা বলছিস।এমনিতেই রাতভর ওই আশার আর আদনান ভাইয়ের কাহিনি শুনতে শুনতে কান ব্যথা হয়ে গেছে,ঘুমাতে পারি নি সারারাত ধরে। এখন ঘুমাতে দে। কষ্ট করে একবার গিয়ে দেখ ধ্রুব ভাই আসার কতোদূর! স্টেশনে কে গেছে তাকে আনতে? ” শালুক চমকালো।ধ্রুব ভাই এখনো আসে নি?তারমানে এখনো সন্ধ্যা হয় নি।আর সে কি-না ভয় পেয়েছে এই ভেবে যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আনন্দিত হয়ে শালুক নিচে নেমে এলো। হাসনা রান্না ঘরে, সবার জন্য নাশতা বানানো হচ্ছে।বড় চাচী আর মেজো চাচী রুটি বানাচ্ছেন।ফুফু রুটি সেঁকছে।শালুকের মা চুলায় আলু,গাজর,পেঁপে দিয়ে ভাজি করছে। মতির মা মাছ কুটছেন। শালুক নাক সিঁটকালো।এইসব হাবিজাবি ভাজাভুজি খেতে শালুকের একেবারে বিরক্ত লাগে। মেজো চাচা চোরের মতো মুখ করে বসে আছে সোফায়।শালুকের ভীষণ মায়া হলো চাচার জন্য।এই লোকটা কতো বছর ধরে ছেলের মুখে বাবা ডাক শোনে না।বাবা ছেলে মুখোমুখি হন না।একসাথে বসে খান না। শালুককে দেখে সেলিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,”স্কুলে যাবি কখন?” শালুক আকাশ থেকে পড়েছে যেনো স্কুলের কথা শুনে। বিস্মিত হয়ে বললো,”এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে তুমি আমাকে স্কুলে যেতে বলো চাচা?সামান্য লেখাপড়ার জন্য তো আর আমি আমার জীবন রিস্কে ফেলতে পারি না, তাই না?বেঁচে থাকার অধিকার আমার ও আছে।” আদনান চায়ের কাপ নিয়ে আসতে আসতে বললো,”সেই সাথে পরীক্ষায় গোল্লা মারার অধিকার ও শালুকের আছে।” শালুকের ভীষণ বিরক্তি লাগলো। মনে মনে বললো, “ফার্দিকার সামনে স্মার্ট হতে চাচ্ছো সে আমি ভালো করেই বুঝি।একদিন সবকিছুর শোধ নিবো।শুধু তোমার প্রতি একটা ভালোবাসা ভালোবাসা ব্যাপার আছে বলে চুপ করে থাকি।” বাহিরে রিকশার টুংটাং শব্দ হতেই সেলিম সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন।তারপর ব্যস্ত হয়ে উপরে চলে গেলেন।হাসনা বেগম চিৎকার করে বলতে লাগলেন,”আমার ধ্রুব বাবা আসছে রে,তোরা সব কোথায় গেলি।” পাতলা একটা সাদা টি-শার্ট পরনে,ব্ল্যাক ট্রাউজার পরে ধ্রুব তখন আধ ভেজা হয়ে হাসনা বেগমের শাড়ির আঁচলে চুল মুছছে।সবাইকে সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলো আদনানের দিকে।তারপর দুই ভাই কোলাকুলি করলো। আদনান আশার দিকে তাকিয়ে বললো, “তোর হবু ভাবী,আশা।আর আশা,এই তোমার বড় দেবর ধ্রুব।” আশা বিড়বিড় করে বললো, “হ্যান্ডসাম! ” শাপলা ততক্ষণে সেজেগুজে হাজির হয়ে গেলো নিচে।ধ্রুবর পাশে দাঁড়িয়ে বললো, “কেমন আছো ধ্রুব ভাই?” ধ্রুব মুচকি হেসে বললো, “ভালো আছি,তোরা সব কেমন আছিস?” শাপলা গাল ফুলিয়ে বললো, “এতোদিনে মনে পড়লো? ” কিছু না বলে ধ্রুব হাসলো। শালুক ঘোমটা টেনে দিয়ে বসে রইলো শক্ত হয়ে। ধ্রুব কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে শালুকের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললো, “ভাব বেড়ে গেছে না-কি তোর?সবাই আমার সাথে কথা বলছে আর তুই ভাব নিয়ে বসে আছিস এখানে?আমার ব্যাগটা রুমে নিয়ে রেখে আয়।ব্যাগের সব কাপড় চোপড় সুন্দর করে গুছিয়ে রাখবি আমার আলমারিতে। ভাঁজ যেনো না ভাঙে শালুক,আই রিপিট ভাঁজ যেনো না ভাঙে। তাহলে তোকে দিয়েই আয়রন করাবো মনে রাখিস।” শাপলা বললো,”আমাকে দাও,আমি রেখে আসি।” চোখ লাল করে ধ্রুব তাকালো শাপলার দিকে।তারপর বললো,”তোকে আমি বলেছি?” শাপলা নিভে গেলো ধ্রুবর চোখ রাঙ্গানো দেখে। ধ্রুবর রুমে গিয়ে সব কাপড় বের করে শালুক সব দলা মোচড়া করলো প্রথমে।সবগুলোর ভাঁজ নষ্ট হবার পর এলোমেলো করে সবকিছু আলমারিতে গাদাগাদি করে রাখলো। ব্যাগের উপরের চেইন খুলতেই শালুক অবাক হলো। ভেতরে একটা শপিং ব্যাগে প্লাস্টিকের ফুলের বিভিন্ন রঙের কয়েকটা গাজরা,নানান ডিজাইনের হেয়ার ব্যান্ড।একটা চিরকুটে লিখা,”কেশবতীর জন্য।” শালুক মুখ বাঁকিয়ে বললো, “তলে তলে টেম্পো চলে,আমরা বললেই হরতাল!” নিচে আসতেই দেখে সবাই খেতে বসেছে। মেজো চাচা নেই শুধু।শালুক আসতেই ধ্রুব বললো,”তোর চাচাকে বল খেয়ে যেতে,আমি পরে ছোট চাচীর সাথে খাবো।উনি আর ওনার স্ত্রী যেনো খেয়ে আমার সামনে থেকে বিদায় হয়।” শালুকের বড় চাচা আজাদ সাহেব বললেন,”ধ্রুব বাবা,এখনো এসব ধরে বসে থেকে কি লাভ?শুধুশুধু বাবা ছেলের মধ্যে… ” আজাদ সাহেব কথা শেষ করতে পারলেন না।ধ্রুব কঠোর স্বরে বললো, “এই ব্যাপারে আমি কারো থেকে কোনো সুপারিশ শুনতে চাই না।” আজাদ সাহেব থেমে গেলেন।শালুকের বাবা ফয়েজ আহমেদ একটা নিশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। ধ্রুব গিয়ে দাদার রুমে বসে রইলো। নাশতা শেষ করে ধ্রুবর দাদা রশিদ সাহেব নাতির পাশে এসে বসলেন।তারপর নরম স্বরে বললেন, “আমাকে মাফ করে দিস দাদাভাই। আমার জন্যই তোর শৈশব,কৈশোর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার জন্যই তুই বাবা মা হারা হলি।” ধ্রুব হেসে বললো, “তোমার কোনো দোষ নেই দাদা।এসব ভেবে তুমি আপসেট হইও না।” দাদার রুম থেকে বের হয়ে ধ্রুব ছাদের দিকে গেলো।ছাদের নিজের রুমে ঢুকে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেলো ধ্রুব।দেয়ালে দীপালি নামক মহিলার একটা ছবি ঝুলছে। মুহুর্তেই ধ্রুব ক্রোধান্বিত হয়ে গেলো। ছবিটি নামিয়ে সোজা নিচতলায় গেলো। সবাই তখনো ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে। আচমকা ধ্রুব ছবিটি আছড়ে ফেললো ফ্লোরে।মুহুর্তের মধ্যে শত খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেলো ফ্রেমের সব কাঁচ।কয়েকটা কাঁচ কুড়িয়ে নিয়ে ধ্রুব আবারও ভাঙ্গলো। ফলস্বরূপ নিজের দুই হাত কেটে গেলো কিছুটা। চিৎকার করে ধ্রুব বললো, “এই কাজ কে করেছে?আমার অপছন্দ জেনেও কে এই কাজ আবারও করেছে ছোট চাচী? এই ছবি আমার ঘরে কেনো লাগানো হলো?” হাসনা নিজেও জানে না কে লাগিয়েছে।কিন্তু ধ্রুবকে এভাবে রাগতে দেখে বললেন,”বাবা মাথা গরম করিস না।আমি লাগিয়েছি বাবা।আমার ভুল হয়েছে। আর হবে না এরকম।” ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে ধ্রুব বললো, “শুধু তুমি বলে আজ আমি থেমে গেলাম। এই কাজ আর করো না চাচী।নয়তো ধ্রুবকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।এখন তো তুমি আছো বলে তোমার টানে ফিরে আসি,এরপর আমাকে আর খুঁজে পাবে না।” তারপর হনহনিয়ে দোতলায় নিজের রুমে চলে গেলো ধ্রুব। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ফরিদা থরথর করে কাঁপছে। হাসনা তার দিকে তাকাতেই ফরিদা বললো, “আমার ভুল হয়ে গেছে আপা।ধ্রুবর বাবা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে এই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। বউ হয়ে আমি কিভাবে সহ্য করি বলেন যে আমার স্বামী তার প্রথম স্ত্রীর ছবি এভাবে লুকিয়ে দেখে?তাই ছবিটি আমি ধ্রুবর ছাদের ঘরে লাগিয়ে রেখেছি।ভেবেছি মায়ের ছবি দেখলে ধ্রুবর রাগ একটু হলেও কমবে।এখন দেখছি আমি ভুল ছিলাম।” হাসনা কঠোর স্বরে বললো, “এরকম কাজ আর কখনো করতে যেও না আপা।আমাকে জিজ্ঞেস না করে আর কখনো এসব কাজ করবে না।” শালুকের ভীষণ মায়া হলো ধ্রুব ভাইয়ের জন্য।একটা মানুষ মনের ভেতর কতো যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখে তা আমরা বাহিরে থেকে কি একটুও বুঝতে পারি? মা নেই,বাবা থেকেও নেই,একা জীবন যে কাটায় তার কষ্টের গভীরতা কে মাপতে পারে? হাসনা শালুককে ডেকে বললো, “ধ্রুবর ঘরে ওর নাশতা নিয়ে দিয়ে আয় শালুক।” নাশতার ট্রে হাতে নিতেই শালুকের রাগ হলো। সে খেয়েছে হাবিজাবি ভাজাভুজি দিয়ে অথচ ধ্রুব ভাইয়ের জন্য ঘন করে বানানো দুধ চা,পরোটা, কসা মাংস,ডিম ভাজা। শালুক মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে বললো, “এই যে আমার মা হয়ে আমার সাথে খাবার নিয়ে এই বাটপারি করলো মা,আমার কি কষ্ট কম হচ্ছে?সবাই ধ্রুব ভাইয়ের ব্যথা অনুভব করে,শালুকের ব্যথা কেউ বুঝে না।” অভিশাপ দিলাম ধ্রুব ভাইকে,এই খাবার খাওয়ার পর তার পেট খারাপ করুক।যাতে বাথরুমেই তার থাকার ব্যবস্থা হয়।স্যালাইন ছাড়া আর কিছুই যাতে খেতে না পারে। ” চলবে……

শালুক ফুলের লাজ নাই !! Part- 02

লুক সিদ্ধান্ত নিলো ওই হার্দিকাকে ও আশা বলে ডাকবে না,হার্দিকা ও বলবে না।ও তাকে ফার্দিকা বলে ডাকবে।রাতে খাওয়ার সময় শালুক বসলো না প্রথম ব্যাচে।শালুকদের বাড়িতে মা, চাচী,ফুফু,দাদী এরা সবাই পরের ব্যাচে বসে।শালুকের ওই ফার্দিকাকে সহ্য হচ্ছে না কিছুতেই।খেতে বসে আদনান ভাইয়ের করা আদিখ্যেতা দেখলে শালুকের ইচ্ছে করবে কাঁচের গ্লাস ছুড়ে ফার্দিকার মাথা ফা/টিয়ে দিতে। তবে একটা নাটক দেখার লোভ ও শালুক সামলাতে পারলো না। নয়না আপার সামনে আদনান ভাই কিভাবে ফার্দিকাকে যত্ন খাওয়ায় তাই দেখার ইচ্ছা। শালুক স্টাডি রুম থেকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ফ্রিজের পাশে বসলো। ফ্রিজ আর ডাইনিং টেবিলের দূরত্ব ১০-১২ হাত। নয়না বসেছে আদনানের মুখোমুখি। আদনান মুরগির কলিজা ভুনা নিয়ে আশার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, “এটা খেয়ে দেখো,ছোট চাচীর হাতের স্পেশাল রান্না এটা।তোমাকে বলেছি না ছোট চাচী হচ্ছে দ্রৌপদীর ছোট বোন,উনি যা রান্না করেন তাই বেস্ট হয়।” আশা মুচকি হেসে বাটিটা নিতে যাবে তখনই নয়না বললো,”বাটিটা এদিকে দাও তো আশা যদি তুমি না খাও।নিধিকে আবার সবসময় এসব পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হয়।এখন তো এসব খাবার ছোটদের বেশি দরকার। ” আশা হাসিমুখে বাটিটা ঠেলে দিলো নয়নার দিকে।আদনান জ্বলন্ত দৃষ্টিতে নয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। নয়না মুচকি হেসে বললো, “আশা তুমি আবার ভেবো না যেনো তোমার মুখের খাবার আমি কেড়ে নিয়েছি।না বোন,আমার আবার এসব অভ্যাস নেই।এসব আমাকে দিয়ে হয় না,মেয়েটা আবার সব খাবার মুখে তোলে না।বাবার আদরের মেয়ে তো,ডাল ভাত দিলে নাক সিটকায় এই মেয়ে এখনই। ওর বাবা ও তেমন, মেয়ে কি খাবে তা আগে হাজির করে রাখে।” আশা হেসে বললো, “না না নয়না,এসব কি বলছো।নিধি বাচ্চা মানুষ, ওর তো এসব খেতে হবে এখন।” আশা না বুঝলেও আদনান ঠিকই বুঝলো নয়না কি বুঝাতে চেয়েছে।আশা যদি বুঝতো নয়না তাকে মিন করে কথাটা বলেছে,আদনানকে আশা কেড়ে নিয়েছে তবে আদনানের কপালে শনি ছিলো। নয়না বাড়িতে যতোক্ষণ আছে আদনানকে সতর্ক থাকতে হবে।কোনো ভাবেই যেনো নয়না আদনানের সাথে আলাদা করে কথা বলতে না পারে। বহু চেষ্টায় আদনান এই বড় মাছকে বঁড়শিতে গেঁথেছে। এ নয়না,শালুকের মতো চুনোপুঁটি নয়,রাঘব বোয়াল। চোখ মুখ শক্ত করে আদনান নয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। দূর থেকে তার দিকে তাকিয়ে রইলো শালুক।নয়নার কথাতে শালুক খুশি হলেও বুকের ভেতরের জ্বলুনি কমছে না। ইচ্ছে করছে আদনান ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে,”আমাকে এভাবে ঠকালে কেনো আদনান ভাই,আমি তো তোমার বউ হবার স্বপ্ন দুচোখ ভরে দেখেছিলাম।আমার কি দোষ ছিলো? ” প্রথম ব্যাচের খাবার শেষ হওয়ার পর মহিলারা খেতে বসলো। শালুকের ততক্ষণে ক্ষিধে মরে গেছে।বুকভর্তি যন্ত্রণা শালুককে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। হাসনা এবার আর শালুককে আলাদা খেতে দিলেন না।নিজের পাশে বসিয়ে দিলেন।একপাশে শান্ত আর অন্য পাশে শালুককে নিয়ে হাসনা খেতে বসলেন।শান্ত শালুকের ছোট ভাই,৯ বছর বয়স। ডান পা আর ডান হাতে ওর কিছুটা সমস্যা আছে।ডান পা বাম পায়ের চাইতে খাটো হওয়ায় সমান তালে হাটতে পারে না।ডান হাতে খেতে পারে না,গুছিয়ে কথা বলতে পারে না,সহজে কিছু বুঝতে পারে না। অথচ দুচোখ ভর্তি মায়া তার,চেহারা দেখলে মনে হয় যেনো দেবশিশু। শালুকের সবচেয়ে বেশি মায়া তার এই ছোট ভাইয়ের জন্য। হাসনা এক লোকমা শালুকের মুখে দিচ্ছেন এক লোকমা শান্তর মুখে দিচ্ছেন।নিজে খাচ্ছেন না। খাওয়াতে খাওয়াতে শালুকের মেজো চাচী ফরিদাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ধ্রুবকে কল দিয়েছো আপা?” ফরিদা চোখ নিচু করে বললো, “আমার কল কি ও কখনো রিসিভ করে আপা?,আপনি দিয়ে দেখেন,এই জগৎ সংসারে আপনি ছাড়া অন্য কাউকে তো ও মান্য করে না।” ধ্রুব ভাইয়ের কথা শুনে শালুকের চোখ মুখ শুকিয়ে গেলো, কাশি লেগে গেলো। হাসনা মেয়েকে পানি খাইয়ে দিয়ে বললেন,”মানুষ হবি না তুই আর।হাতে পায়ে বড় হয়েছিস শুধু মাথায় বুদ্ধি হয় নি।” হাসনার কথার মধ্যেই শাপলা ফোন নিয়ে ছুটে এসে বললো, “মা ধ্রুব ভাই কল দিয়েছে। ” হাসনা বেগমের চোখ মুখ ১০০ ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলজ্বল করে উঠলো। কল রিসিভ করেই বললেন,”হ্যাঁ বাবু,বল কেমন আছিস?তোর কথাই বলছিলাম তোর মায়ের সাথে।হাজার বছর বাঁচবি তুই।” ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ধ্রুব বললো, “আমি ভালো আছি চাচী।তোমরা সবাই কেমন আছো?” “আমরা ও ভালো আছি বাবা।জানিস তো,আজ সকালেই তোর ভাই এসেছে। খোকা আর ওর হবু বউ এসেছে আমেরিকা থেকে। বাসায় সবাই আছে, শুধু তুই নাই।” “আমি ও আগামীকাল আসছি চাচী,ক্যাম্পাসে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরাট ঝামেলা লেগেছে। মারামারি, ভাঙ্গাভাঙ্গি চলছে হরদম। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ,এমনকি হল ও বন্ধ করে দিয়েছে। এবার আর না এসে পারছি না বাসায়।রাতের ট্রেনেই উঠছি,সকাল সকাল বাড়ি পৌঁছে যাবো।” হাসনা বেগম আনন্দিত গলায় বললেন,”এরকম ঝামেলা যেনো তোর ক্যাম্পাসে সবসময় হয় বাবু,তাহলে অন্তত আমরা তোকে চোখে দেখার সুযোগ পাবো।খোকা বিদেশে ছিলো তাও ওকে রোজ ভিডিও কলে দেখতাম,অথচ তুই দেশে থেকেও আজ দুই বছর তোকে দেখি না।তোর চেহারাও প্রায় ভুলতে বসেছি।” এই বাড়িতে সবাই আদনানকে খোকা বলে ডাকে আর ধ্রুবকে বাবু বলে ডাকে। “এবার আসলে একটা ছবি বাঁধাই করে তোমার বেডরুমে লাগিয়ে দিয়ে যাবো।প্রতিদিন ছবিটা দেখলে আর ভুলবে না।” স্পিকার অন থাকায় সবাই খিলখিল করে হাসতে লাগলো ধ্রুবর কথা শুনে। ধ্রুব কল কেটে দিলো। ফরিদা বেগম কাঁচুমাচু হয়ে বললেন,”আপা,ধ্রুবর রাগ কি এখনো কমে নি?আমার ভীষণ খারাপ লাগে আপা।আমি কি দোষ করেছি,আমি তো জানতাম না ধ্রুবর বাবা মায়ের ব্যাপারে কোনো কিছু।মাঝখান থেকে ফেঁসে গেলাম আমি।তাছাড়া তখন অল্প বয়স ছিলো, সংসার বুঝতাম না।” হাসনা বেগম আশ্বাস দিয়ে বললেন,”ভেবো না আপা,সব ঠিক হয়ে যাবে।” শালুকের হাত পা কাঁপতে লাগলো থরথর করে। আদনান ভাই তো ফেলটুস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ত্থাকে,এই বান্দা তো তার ও এক কাঠি উপরে।শালুক মনে মনে বললো, “মরার উপর খাড়ার ঘা বুঝি একেই বলে আল্লাহ?” হাসনা বেগম মতির মাকে ডেকে বললেন, “ধ্রুবর ঘর সবগুলো গুছিয়ে ফেলতে হবে রাতের মধ্যেই। ছাদের রুমটা তুমি পরিষ্কার করো,আমি ওর বেডরুম আর স্টাডি রুম গুছিয়ে ফেলছি। ” মতির মা চোখ মুখ করুণ করে বললো, “আম্মা,এখন আমারে যদি কন একটা সুতা আইনা দিতে আমি তাও আনতে পারমু না।স্টার জলসায় অক্ষন আমার সিরিয়াল দেখনের সময়। এখন আমারে ডিস্টাপ দিয়েন না।” হাসনা বেগম জানেন এখন মতির মা’কে দিয়ে কিছু করানো যাবে না।পানের বাটা কোলে নিয়ে শালুকের দাদী সিতারা বেগমের রুমে যাবেন,তারপর ওনার হাতে পায়ে মালিশ করবেন আর দুজনে মিলে সিরিয়ালের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করবেন। হাসনা বেগম মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন,”তোরা দুইজন ছাদের রুমটা গুছিয়ে ফেল গিয়ে।কতোদিন পর ছেলেটা আসবে।” শালুক মুখ বাঁকালো,শাপলা তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলো। দুই বোন ছাদে গিয়ে ধ্রুবর রুমটা গুছাচ্ছে।শালুক কাজের চাইতে অকাজ বেশি করছে। এই যেমন ধ্রুবর সবগুলো মেডেল এলোমেলো করে রাখছে।টেবিলের উপর থাকা ধ্রুবর বই যেভাবে সাজানো ছিলো শালুক সেগুলো এদিক সেদিক করে রাখছে।শাপলা গিয়ে ওয়াশরুম পরিষ্কার করছে।শালুক আলমারি থেকে তেলাপোকা বের করে ধ্রুবর বিছানার নিচে রেখে বিছানার চাদর তোশকের নিচে গুঁজে রাখলো যাতে করে তেলাপোকা বের হতে না পারে। মার্কার পেন দিয়ে বাম হাতে রিডিং টেবিলের সাথের দেয়ালে লিখলো,”আমি ধ্রুব,সবকিছুতে সিরিয়াস থাকি।সিরিয়াস থাকতে থাকতে আমার টয়লেট ও সিরিয়াস হয়ে গেছে। এজন্য সহজে আমার টয়লেট পায় না।” নিজের লিখা দেখে শালুক নিজেই সন্তুষ্ট হলো।রাইটিং এক্সপার্টের বাবার ও সাধ্য নেই বের করে যে এই লিখা শালুক লিখেছে।শালুকের প্রতিশোধপরায়ণ মন কিছুটা শান্তি পেলো।সেই কবেকার কথা,ধ্রুব ভাই বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে একদিন শালুকের সব হোমওয়ার্কের মাঝখানে গোটগোট করে লিখে দিয়েছিলো,”আমি শালুক,মাথা ভর্তি গোবর নিয়ে থাকি।এজন্য সবসময় আমার শরীর থেকে গোবরের সুবাস আসে।গোবরভর্তি মাথায় এজন্য আমার পড়ালেখা ঢুকে না।” সেদিন এক বিষয় হোমওয়ার্ক ও শালুক স্যারদের দিতে পারে নি। দুই হাত লাল করে বাড়িতে এসেছে স্যারদের বেতের মার খেয়ে। ধ্রুবর উপর শালুকের ভীষণ ক্ষোভ। ছোট বেলা থেকেই এই লোকটা শালুককে জোর করে সব কিছুতে।বিশেষ করে পড়ার ব্যাপারে। যেখানে শালুক নিজেই জানে তার মাথা ভর্তি গোবর, এই মাথায় লেখাপড়ার চাইতে বেগুন টমেটোর চাষ করে লাভবান হওয়া যাবে সেখানে এই ধ্রুব কিছুতেই তা মানতে চায় না।তার কথা হচ্ছে আল্লাহ সবাইকেই মেধা দিয়েছে, শালুক নিজের মেধায় জং ফেলে দিয়েছে। শালুকের উচিৎ সেই মেধায় শান দিয়ে ধারালো করা।শালুককে পড়ানোর জন্য সবসময় খেপাতে থাকে ধ্রুব।যাতে করে রাগের বশে হলেও শালুক একটু পড়ে। কিন্তু শালুক কেনো জানি এই একটা ব্যাপারেই রাগ করতে পারে না। কিছুতেই না,যদি একটু রাগ করতে পারতো তবে সব বিষয়ে খারাপ করলেও অন্তত ইসলাম শিক্ষায় তো ভালো করতো।অথচ শালুক সব বিষয়ে টেনেটুনে পাশ মার্কস পায় আশেপাশের সবার থেকে দেখে দেখে। মাঝেমাঝে শালুক নিজেই নিজেকে বলে, “এতো গাঁধা স্টুডেন্ট যে এই পৃথিবীতে আছে তা আমি আমাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।প্রাউড ফিল করছি নিজেকে নিয়ে। ” শাপলা এসে দেখে শালুক তেমন কিছুই করে নি রাগে গজগজ করতে করতে শাপলা সোফা মুছলো,সেন্টার টেবিল মুছলো।ছোট ফ্রিজটা মুছলো।শালুককে কড়া গলায় বললো, “জলদি করে বইয়ের আলমারিটা মুছে ফেল শালুক।তারপর সবগুলো ক্রেস্ট মুছবি।” শাপলা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে দেয়ালে লাগানো ধ্রুবর মা দীপালির ছবিটা নামিয়ে আনলো।তারপর কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,”দেখ শালুক,তোর আর চাচীর ছবির মধ্যে কতো মিল রয়েছে। ” শালুক চাচীর ছবি দেখে কেঁপে উঠলো। শালুকের নাকের গড়ন মেজো চাচীর মতোই।ভয়ার্ত স্বরে শালুক বললো, “আপা,ছবিটা এখানে লাগানো কি ঠিক হয়েছে? কে লাগালো এখানে?কবে লাগালো? ” শাপলা মাথা নেড়ে বললো, “কি জানি শালুক,আমি তো জানি না।এই ঘরে আজকেই তো এলাম।দেয়ালে লাগানো দেখে পরিষ্কার করতে নামিয়েছি।” শালুকের ভীষণ ভয় হলো।ধ্রুব ভাই নিজের মায়ের ছবি দেখলে কেমন রিয়েক্ট করবেন কে জানে? ফিসফিস করে শালুক বললো,”ছবিটা লুকিয়ে রাখ আপা,ধ্রুব ভাই রাগ করে বাড়ি থেকে চলে ও যেতে পারে। ” শাপলা একটুক্ষণ ভেবে বললো, “এমন ও তো হতে পারে,মায়ের ছবি দেখলে ধ্রুব ভাইয়ের রাগ কমবে।অনেক বছর তো হলো, এখনো কি সেই রাগ পুষে রেখেছে না-কি? ” শালুক কোনো কথা বলতে পারলো না। তবে বুকের ভেতর কেমন ভয়ের শিহরণ বইতে লাগলো। শালুকের এই ভয় একটু পরেই যন্ত্রণায় রূপ নিলো যখন দেখলো আদনান ভাই আর ফার্দিকা ছাদে এসে হাত ধরাধরি করে হাটছে। শাপলা আর শালুক দুজনেই ধ্রুবর রুম থেকে বের হয়ে এলো। ধুপধাপ পা ফেলে শালুক চলে গেলো। নিজের রুমের সামনে গিয়ে ও শালুক থেমে গেলো। বেহায়া মনটা বারবার বলছে চোরের মতো গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে এরা ছাদে কি করছে? এই ফার্দিকা কি আদনান ভাইকে আবারও চুমু খাচ্ছে? শালুকের ভীষণ কষ্ট হলো এটা ভাবতেই।লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে,সকল ম্যানার ভুলে গিয়ে শালুক পা টিপে টিপে ছাদের দিকে গেলো।ছাদের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখলো দুজনেই দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে,দুজনের হাতে দুটো সিগারেট জ্বলজ্বল করছে আবছা অন্ধকারে। চমকে উঠলো শালুক! এই ফার্দিকা মেয়েটা ধুমপান করে?এ ও সম্ভব! আদনান ভাই এরকম একটা মেয়েকে বউ করতে চাচ্ছে?আদনান ভাইয়ের রুচি এতোটা খারাপ? শালুক আর দাঁড়াতে পারলো না ছাদে।নিচে নেমে এসে নিজের রুমে বসে ভাবতে লাগলো। শালুকের ছোট্ট জীবনে শালুক এতোটা অবাক আর হয় নি।ছেলেরা ধুমপান করে এই ব্যাপারটাই শালুকের যেখানে মেনে নিতে আপত্তি সেখানে ফার্দিকার ধুমপান করাটা শালুকের কাছে রীতিমতো অষ্টম আশ্চর্য! ঘুমানোর সময় একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেলো।শালুক এসেছিলো বড় চাচীর কাছে চুল বাঁধতে,এসে দেখে চাচী আদনান ভাইয়ের রুমে। ফার্দিকা আদনান ভাইয়ের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আদনানের মা আদিবা বেগম বোনঝিকে ফিসফিস করে বললেন,”এটা বাংলাদেশ আশা,এখানকার কালচার অন্যরকম। সবাই কি মনে করবে তোরা এখনই একসাথে এক বিছানায় থাকলে?তুই আয়,তোর জন্য আমি অন্য একটা রুম গুছিয়ে রেখেছি সকালেই।” আশা হতভম্ব হয়ে বললো, “এটা কেমন কথা আন্টি,আমি আর আদনান কেউই অবুঝ নয়।আমেরিকাতেও আমরা প্রায় সময় এক বেডে থাকতাম।তখন তো কোনো প্রবলেম হতো না। এখানে কিসের প্রবলেম আন্টি?” আদনান মায়ের সামনে লজ্জা পেলো কিছুটা, তারপর আশাকে নানা ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে বললো, “প্লিজ আশা,ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড বেইব।” আশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, “ওকে ফাইন।তবে আমি একা ঘুমাতে পারবো না। আমি শালুকের সাথে ঘুমাবো।” আদনান চমকে উঠলো শুনে।শালুক,নয়না কেউই নিরাপদ নয়।আদনান ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বললো, “শালুকের ঘুমের ঘোরে হাটাচলা করার অভ্যাস আছে,ওর পাশে কেউ ঘুমালে তার গলা টিপে ধরে ঘুমের ঘোরে,লাথি মেরে ফেলে দেয় বিছানা থেকে। বেইব,আমি তোমার কোনো ক্ষতি হোক তা চাই না।তুমি বেটার শাপলার সাথে ঘুমাও।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশা বের হয়ে গেলো আদনানের রুম থেকে।আড়ালে দাঁড়িয়ে শালুক এসব শুনে রেগে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড়িয়ে বললো, “আদনাইন্নার বাচ্চা, আমার নামে এসব মিথ্যা কথা বললি তুই?মনে রাখিস,এসব কিছু একদিন আমি বাস্তবায়ন করবো তোর আর তোর ফার্দিকার উপরে। যদি না করি তবে আমি ফেলটু শালুক না।এই দুইতলার ফ্লোরের উপর দাঁড়িয়ে শপথ নিলাম।কসম এই দুইতলার, যদি না করি তবে এই দুইতলা ভূমিকম্পে ভেঙে যাবে।” চলবে…… রাজিয়া রহমান

শালুক ফুলের লাজ নাই !! লেখাঃ রাজিয়া রহমান

শালুক ফুলের লাজ নাই !! আদনান গাড়ি থেকে নেমে হাত বাড়িয়ে জিন্স,টপস পরা এক মেয়েকে বের করে আনলো। চার বছর ধরে দেখা শালুকের দুই চোখ ভর্তি স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে আর এক মুহূর্ত ও সময় লাগলো না সেই মুহুর্তে। আদনান ভাই!শালুকের আদনান ভাইয়ের পাশে এই কে?এরকম হবার তো কথা ছিলো না। অথচ আদনান ভাই আসবে বলে শালুক আজ লাল শাড়ি পরেছে।আদনান ভাই তো তাকে বলেছিলো,শাড়িতে শালুককে একেবারে বউ বউ লাগে,তিনি যেদিন দেশে আসবেন শালুক যেনো একটা লাল শাড়ি পরে সেদিন। আদনান সবার সাথে বিদেশিনীর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে,শালুকের সামনে এসে বললো, “মিট মাই লাভলি লিটল সিস্টার।শালুক,এই তোর ভাবী আশা।যদিও ওর নাম হার্দিকা তবে আমি ওকে ভালোবেসে আশা বলি।ওর বিদেশি নাম তো সবাই ঠিক করে বলতে পারবে না।হার্দিকা নামের অর্থ জানিস?অর্থ হচ্ছে প্রেমে ভরা একটি হৃদয়। আর তুই তো আরো আগে ওর নাম ভুল উচ্চারণ করবি,এমনিতেই সারাবছর অংক আর ইংরেজিতে ডাব্বা মারিস।” একদমে কথাগুলো বললো আদনান। আদনানের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। লজ্জায়,অপমানে শালুকের দুই কান লাল হয়ে গেলো। শালুক তাকিয়ে দেখে তার নিজের মা বাবা ভাই বোন ও হাসছে সবার সাথে তাল মিলিয়ে। শালুক ফুলের লাজ নাই এক মুহুর্ত ও দাঁড়ালো না শালুক সেখানে আর।এক ছুটে ছাদের ছোট্ট খুপরি ঘরে গিয়ে লুকালো।ভেতর থেকে কে যেনো বিদ্রোহ শুরু করেছে।বারবার বলছে,”আদনান তোকে ঠকিয়েছে শালুক।তুই ঠকেছিস।” শালুকদের বিশাল বাড়িটি সাড়ে তিনতলা।এক তলায় ১৫ টা করে রুম। দুই তলার ছাদের অর্ধেক জুড়ে আছে বিভিন্ন ফল,ফুলের গাছ,দোলনা,বসার জন্য বেঞ্চি।তার একপাশে দুইটা রুম ও আছে।আর অন্যদিকে আছে ছোট একটা খুপরি। খুপরি আর দুইটা রুমের মাঝখানে বিশাল খালি জায়গা।খুপরিটা শালুকের একান্ত ব্যক্তিগত। খুপরি ঘরের নীল দরজায় কালো মার্কার পেন দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লিখা,”শালুকের রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম।” ভেতরে ঢুকে শালুক শাড়িটি খুলে ফেললো। সেলোয়ার-কামিজ পরে একটা কাঁ/চি নিয়ে শাড়িটি অসংখ্য টুকরো করে ফেললো কে/টে।ক্লাস টেনে পড়ুয়া শালুকের কাছে মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে পৃথিবীতে তারচেয়ে বেশী অসহায় আর অন্য কেউ নেই। একপাল বাচ্চার মধ্যে বড় হওয়া শালুক খুব ছোট বেলায় টের পেলো আদনান ভাই নামক মানুষটাকে তার ভীষণ ভালো লাগে।আদনান ভাই শালুকের নাম ধরে ডাকলে শালুকের ভীষণ লজ্জা লাগতো। এই ভালো লাগা কি শালুক জন্ম দিয়েছে? মোটেও না,আদনান ভাই যেদিন থেকে ওকে হেসে হেসে বলতো,”এই ফেলটুস শালুককে আমি ছাড়া অন্য কেউ বিয়ে করবে না।”সেদিন থেকেই শালুক লজ্জা পেতো।সেই লজ্জা ধীরে ধীরে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় রূপ নিলো। শালুক ফুলের লাজ নাই সবাই তাকে আদনানের বউ বলে খেপাতো।সেই ছোট বয়সেই শালুক ধরে নিয়েছিলো আদনান ভাই তার একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ। সেই ধারণা আরো পোক্ত হলো আদনান ভাই বিদেশ যাবার পর। শালুক যখন ক্লাস এইটে উঠলো আদনান ভাই তো সেদিন তাকে বলেছিলো,”জেএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হবে শালুক,আমার বাচ্চারা নয়তো তোকে ফেলটুস মা বলে খেপাবে।” সেদিন আদনান ভাইয়ের কথা শুনে শালুক কল কেটে দিয়েছে। এই লোকটা এতো লজ্জা দিয়ে কথা বলতে পারে! সেই মানুষের পাশে আজ অন্য মেয়ে দাঁড়িয়ে।হার্দিকা না ফার্দিকা নামের একটা মেয়েকে নিয়ে এলো আদনান ভাই? শালুকের কেমন দম বন্ধ লাগছে,অনুভূতিতে আজ সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে।কিশোরী মনের প্রলয়ঙ্কারী ভালোবাসা আদনান বুঝলো না। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে শালুক অঝোরে কাদলো।শালুকের সেই কান্নার একমাত্র সাক্ষী ছিলো নীল আকাশ। এই নীল আকাশ সব কিছুর সাক্ষী, সেদিনও এই আকাশ সাক্ষী ছিলো যেদিন আদনান ভাই তাকে বলেছিলো,”আমার শালুকটা আজ কতো বড় হয়েছে কে জানে!চুমু খাওয়ার মতো বড় হয়েছে কি?” বৈশাখ মাস শুরু হয়েছে,হঠাৎ করেই নীল আকাশ কালো হয়ে গেলো। শালুকের অশান্ত মনের মতো আকাশটাও মুহুর্তে আশান্ত হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। শালুক বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না,বৃষ্টির পানিতে ওর এলার্জি আছে। জানালার কাঁচের এপাশে দাঁড়িয়ে শালুক চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে আর তার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে আকাশ ও সমানতালে বর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই শালুক দেখতে পেলো আদনান ভাই মেয়েটার হাত ধরে ছাদে চলে এসেছে। দুজন মিলে হাত ধরাধরি করে বৃষ্টিতে ভিজছে। শালুকের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠলো। হার্দিকা না ফার্দিকা মেয়েটার রিবন্ডিং করা সোজা তারের মতো চুলগুলো লাফালাফি করার কারণে মুখে এসে পেঁচিয়ে গেছে। জানালার ওপাশ থেকে শালুক দেখলো আদনান ভাই পরম যতনে মেয়েটার চুল সরিয়ে দিচ্ছে মুখ থেকে। খিলখিল করে হেসে মেয়েটা তার মাথা নাড়াচ্ছে,তার কাঁধ সমান চুল আদনানের মুখে গিয়ে লাগছে।মুগ্ধ হয়ে আদনান তা দেখছে।মেয়েটা টুপ করে আদনানের গালে একটা চুমু খেলো। শালুকের কি প্রচন্ড রাগ হলো,জানালার পর্দা টেনে দিয়ে কোমর সমান লম্বা চুলগুলো শালুক কাঁ/চি দিয়ে কে/টে একেবারে ঘাড় পর্যন্ত নিয়ে এলো। তারপর এক অজানা শোকে মাথার চুল খামচে ধরে কাঁদতে লাগলো। আদনান ভাই অন্য কারো এটা শালুক মানতে পারছে না কিছুতে।এই ধ্রুব সত্যিটা কেনো শালুকের সহ্য হচ্ছে না, শালুক জানে না। বৃষ্টি থামলো দুইটা বাজার একটু আগে।শালুক তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে।এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো তার? নিজের কান্না কিছুতেই শালুক সামলাতে পারছে না।মতির মা এসে শালুকের খুপরির দরজায় দুমদাম কিল মারতে লাগলো। তারপর চিৎকার করে ডেকে বললো, “সবাই খাইতে বসছে,বড় চাচায় আপনেরে ডাকে। তাত্তাড়ি আইতে কইছে,নয়তো ছোট আম্মা কইছে ঝাড়ু নিয়া আসবো আপনের জন্য।বিদেশি ভাবীর সামনে কি একটা বেইজ্জতি হইবেন আপা।আসেন তাত্তাড়ি।” বিদেশি ভাবী! শালুক করুণ হাসলো শব্দ দুটা শুনে।ভাবী! বাহ! শালুক ফুলের লাজ নাই মাথায় ভালো করে ওড়না পেঁচিয়ে শালুক মতির মা’র সাথে নেমে এলো নিচতলায়। বিশাল ডাইনিং টেবিলে ২৫ টা চেয়ার।শালুকদের যৌথ পরিবার।বাবারা তিন ভাই,তাদের ছেলেমেয়ে, দাদা দাদী, বিধবা বড় ফুফু,তার ছেলেমেয়ে নিয়ে বিশাল বড় সংসার তাদের। শালুক যেতেই আশা বললো, “তুমি আমার পাশে বসো শালুক।” বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে শালুক সরে গেলো। বড় চাচার পাশের চেয়ার খালি ছিলো শালুক সেখানে গিয়ে বসলো। মেয়েটার মুখে বাংলা কথা শুনে শালুক কিছুটা আশ্চর্য হয়েছে। টেবিলে আজ বিভিন্ন পদের খাবার সাজানো। সব কিছু আদনান আসবে উপলক্ষে করা।শালুকের একবার ইচ্ছে হলো, টেবিলে থাকা সব খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিতে। সাহসের অভাবে শালুক পারলো না। তবে অভিমান করে একটা কাজ করলো,নিজের অতি প্রিয় খাবারগুলো ও খেলো না।ডাল আর করলা ভাজি দিয়ে মেখে মেখে ভাত খেতে লাগলো। এক লোকমা ভাত খায় আর এক গ্লাস পানি খায়।শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো প্লেটে অর্ধেক ভাত রয়ে গেছে কিন্তু শালুকের পেটে আর জায়গা নেই। শালুকের মা হাসনা সবাইকে খাবার সার্ভ করছেন,হঠাৎ করে তার নজর গেলো মেয়ের দিকে। করলা দেখলেই যেই মেয়ে নাক সিটকায় সে কিনা করলা দিয়ে ভাত খাচ্ছে, অথচ কলিজা ভুনা,চিংড়ি ভাজা,ইলিশ মাছের ডিমের পাতুরি এসব তার সামনে রয়েছে। হাসনা মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,”কি ব্যাপার শালুক,এসব কি?কি দিয়ে ভাত খাচ্ছিস?” শালুক মাথা নিচু করে বললো, “খেতে ইচ্ছে করছে না মা।করলা তো কখনো খাই না,তাই আজ একটু চেখে দেখলাম।” হাসনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালো। শালুক কিছু বলার আগে আদনান বললো, “ইলিশ মাছের ডিমের পাতুরির বাটিটা এদিকে দাও তো চাচী।আশার আবার মাছের ডিম ভীষণ ফেভারিট। ” হাসনা মেয়ের পাশ থেকে সরে আশার কাছে এলেন।শালুক ততক্ষণে উঠে চলে গেলো। নিজের রুমে গিয়ে বসে রইলো ঘূর্ণয়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে। খাওয়ার পর শাপলা এলো শালুকের রুমে,শালুকের বড় বোন শাপলা।বিছানার উপর পা তুলে বসে বললো, “কি হয়েছে শালুক?এরকম মনমরা হয়ে বসে আছিস কেনো? ” শালুক চোখের জল আড়াল করে বললো, “ভালো লাগছে না আপা।” শাপলা মুচকি হেসে বললো, “কষ্ট হচ্ছে তাই না শালুক?আশাকে দেখে কষ্ট পাচ্ছিস?শোন শালুক,আদনান ভাই মানুষটাই এরকম।সবার মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেওয়ায় ওস্তাদ। তুই জানিস না শালুক,মেয়েদের মন ভাঙ্গায় আদনান ভাইয়ের জুড়ি মেলা ভার।বড় ফুফুর মেয়ে নয়না আপা,আদনান ভাইকে কি ভীষণ ভালোবাসতো।আদনান ভাই ও তাতে সায় দিতো।সে হচ্ছে ধরি মাছ,না ছুঁই পানি টাইপের লোক।ওনার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দে শালুক।” শালুক দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে লাগলো। শাপলা একটু সময় থেমে বললো, “আশা কে জানিস শালুক?আদনান ভাইয়ের খালাতো বোন।বড় চাচী সবসময় দেখিস না গল্প করে ওনার এক বোন আমেরিকায় থাকে এটা নিয়ে।আশা ওনার সেই বোনের মেয়ে।আশাকে বিয়ে করলে আদনান ভাইয়ের লাইফ সেটেল হয়ে যাবে।তাছাড়া আশা তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।বুঝিস-ই তো,চাচা চাচী কেনো এতো আদর যত্ন করছে।রাজত্ব, রাজকন্যা দুটোই পাবে আদনান ভাই।সেখানে তুই কি শালুক?তোর কোনো অস্তিত্ব আছে?” শালুকের দুই চোখ আবারও অশ্রুসজল হয়ে গেলো। শাপলা বোনকে টেনে নিলো।শব্দ করে না কান্না করলেও শালুক টের পেলো আপাও কাঁদছে তার সাথে। বিকেলে চায়ের আসরে সবাইকে ডাকা হলো। আদনান সবার জন্য কি উপহার এনেছে তা দিবে সবাইকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শালুককে যেতে হলো, নয়তো মায়ের হাতের মার সব পিঠের উপর দিয়ে যাবে। বাবা,চাচাদের জন্য আদনান ব্রান্ডের ঘড়ি আনলো।মা,চাচী,ফুফুদের জন্য সেইম ডিজাইনের শাড়ি। ছেলেদের জন্য বিভিন্ন রঙের টি-শার্ট। মেয়েদের জন্য মেকাপ, কসমেটিকস আইটেম। দাদার জন্য আনলো কয়েকটা ব্যথানাশক বাম,শীতের চাদর।দাদীর জন্য চাদর,রুপোর কাজ করা একটা পানের বাটি। মতির মায়ের জন্য ও শাড়ি আনলো। সবার শেষে একটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর বের করে শালুককে দিয়ে বললো, “এটা তোর জন্য।অংকে যাতে ফেইল না করিস তার জন্য এই ক্যালকুলেটর। একেবারে অরজিনাল।দাম কতো জানিস এর?” বারবার ফেইল করার কথা তোলায় রাগ করে শালুক ক্যালকুলেটর আদনানের কোলের উপর ছুড়ে মেরে উপরে চলে এলো। সিড়ি দিয়ে উঠার সময় শুনতে পেলো আদনান হেসে হেসে বলছে,”ফেলটুস আবার কেমন রাগ দেখায়,এই রাগ ফেলটু মেয়েদের মানায় না।” শালুকের এতো লজ্জা লাগলো এসব শুনে।কিছু বলতে পারলো না। মনে মনে শপথ নিলো সে ও ভালো করে পড়ালেখা করে সবাইকে দেখিয়ে দিবে। আদনান আসার খবর পেয়ে নয়না রাতেই শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে এলো। আদনান তখন আশার হাত ধরে বাড়ির বাহিরে বাগানে হাটছে।এক বছরের মেয়ে নিধিকে কোলে নিয়ে নয়না আদনানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর হেসে বললো, “কেমন আছো আদনান ভাই? ” নয়নাকে দেখে আদনান ভুত দেখার মতো চমকে গেলো। নয়নাকে এই মুহুর্তে আদনান এক্সপেক্ট করে নি।নয়নার চ্যাপ্টার আমেরিকায় পা দেয়ার সাথে সাথে আদনান ক্লোজ করে দিয়েছে। শুকনো হেসে আদনান বললো, “ভালো আছি নয়না,তুই কেমন আছিস?এই কে তোর মেয়ে?খুব কিউট তো!” নয়না বাঁকা হেসে বললো, “কিউট তো হবেই,আমি তো ফর্সা,মেয়ের বাবা ও ফর্সা।এজন্য আমার নিধিও এতো কিউট।” নিধির নাম শুনে আদনানের বুক কেঁপে উঠলো। নয়নার সাথে প্রেম থাকাকালীন আদনান বলেছিলো,তাদের মেয়ে হলে নাম রাখবে নিধি,আর ছেলে হলে নাম রাখবে নিদ্র। নয়না সেটা মনে রেখেছে দেখে আদনান লজ্জিত হলো।আশাকে সেটা বুঝতে না দিয়ে সহজ গলায় বললো, “ও আমার ফুফাতো বোন নয়না।” আশা হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো নয়নার সাথে। নয়নার বুকে এক অচেনা ব্যথা শুরু হলো। এই ব্যথা সে গত তিন বছর ধরে বুকে মাটি চাপা দিয়ে রেখেছে। আদনান আশার হাত ধরে বললো, “চলো বাসায় যাই।তোমার ক্ষিধে পেয়েছে নিশ্চয়। নাশতা করবে চলো।” নয়না মেয়েকে কোলে নিয়ে আদনানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বিড়বিড় করে বললো, “প্রতারক! ” চলবে…….

সেরা প্রেমের গল্প। মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্পঃ

গল্প-১ প্রেমিক যখন বন্ধু সময়টা ছিল শরৎকাল। আমার এক দাদার বিয়েতে গিয়েছিলাম। দাদার বিয়েতে প্রিয়াঙ্কা নামের একটি মেয়েকে প্রথম দেখাতেই ক্রাশ খেয়েছিলাম। মেয়েটা দেখতে অনেক হাঁসি-খুশি। সেখানেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেদিন প্রিয়াঙ্কার জন্যই বিয়েবাড়িতে দারুন মজা হয়েছিল। প্রথম আলাপেই ভালোলাগা শুরু। মানে love at first sight যাকে বলে আরকি! এরপর যোগাযোগ শুরু হয়ে যায় আমাদের। তার সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে সময় গড়িয়ে যেত, তা কিছুই বুঝতে পারতাম না। এত কথা হলেও আমি কখনোই তাকে জিজ্ঞাসা করিনি যে সে আমাকে ভালোবাসে কিনা? আমি ভেবে নিয়েছিলাম যে, সে যখন আমার সাথে এত কথা শেয়ার করে, তারমানে সে নিশ্চয় আমাকে ভালোবাসে। একদিন সে আমাকে তার বাড়িতে একটি বিশেষ কাজের জন্য ডাকে। আমি ভেবেছিলাম, যে সে হয়ত তার বাবা-মা র সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে। আমি বেজায় খুশি হয়েই তার বাড়িতে যাই। কিন্তু তার বাড়িতে এত আয়োজন দেখে আমি ভেবেছিলাম যে, কোনো অনুষ্ঠান আছে হয়ত। ভেতরে গিয়েই আমি থমকে দাড়াই। আজ প্রিয়াঙ্কার আশীর্বাদ। আমি কাছে যেতেই সে তার হবু বরের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল। “ এ হল আমার এক বন্ধু রূপক।“ “বন্ধু!” আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন দেখা, এত স্বপ্ন গড়া, সব স্বপ্নজাল মুহূর্তের মধ্যে ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গেল। আমার নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল বেড়িয়ে এল। প্রিয়াঙ্কা জিজ্ঞাস করল- “এই রূপক তোমার চোখে জল কেন?” উত্তরে আমি বলি- “আমার বন্ধুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আর হয়ত বন্ধুর সাথে কথা হবে না, সেই দুঃখে চোখে জল চলে এল।” প্রিয়াঙ্কা- “না রে কথা তো হবেই।” হাঁ ঈশ্বর কি ভেবেছিলাম, আর কি দেখছি। আমি যাকে আমার ভবিষ্যৎ ভাবতাম, সে আমাকে বন্ধুর থেকে বেশি ভাবে না। ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরেছলাম। মনে মনে বলে এসেছিলাম- সুখে থাকিস। আর বন্ধু যখন ভেবেছিস, তখন বন্ধু হয়েই থাকব। সেরা প্রেমের গল্প। মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প প্রেমিক যখন বন্ধু premer kahini সেরা প্রেমের গল্প। মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প প্রেমিক যখন বন্ধু premer kahini প্রিয়াঙ্কার বিয়ের পর এখনও সে আমাকে ফোন করে, কিন্তু সেই আগের কথা বলার যে ইচ্ছেটা ছিল সেটি আর নেই। হয়ত হারিয়ে গেছে কোনো মরুভূমির প্রান্তরে। অথবা তলিয়ে গেছে কোনো গভীর সমুদ্রে। পড়ুনঃ- সুন্দর প্রেমের গল্প সুপ্ত প্রেমের বেদনাময় কাহিনী গল্প-২ সময় থাকতে ভালোবাসার মূল্য দিতে শেখো আমার ছোট বেলার বন্ধু নিকিতা। হয়েছিল কি, সে আর অনিক নামের একটি ছেলে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। এই ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ৪ বছর আগের। দুইজনেই পরস্পরকে খুব ভালবাসত। কিন্তু একদিন তাদের মধ্যে কিছু কারণে ঝগড়া বেঁধে যায়! এরপর যা হওয়ার তাই হল, সামান্য কথা কাটাকাটিতেই নিকিতা দেড় বছরের সম্পর্কে ব্রেক-আপ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু অনিক হয়ত নিকিতাকে একটু বেশি ভালবাসত, তাই সে, আলাদা হওয়ার পক্ষপাতী ছিল না। সে যাই হোক, এরপর নিকিতা অনিকের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। দেখতে দেখতে একমাস হয়ে যায়, নিকিতা অনিকের সাথে কোনো কথাই বলেনি। প্রায় ছয় মাস পর, তারা আবার দেখা করে, নিকিতাও হয়ত অনিককে খুব মিস করত। সেদিন তারা অনেক্ষন কথা বলেছিল। কিন্তু না, নিকিতা তার অনুভূতি প্রকাশ না করেই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল সেদিন। সে তার আগেকার জেদ ধরে রেখেছে। হার্ট টাচিং লাভ স্টোরি ব্রেকআপ হওয়ার গল্প হার্ট টাচিং লাভ স্টোরি ব্রেকআপ হওয়ার গল্প এরপর আবার কিছুদিন পর নিকিতা ও অনিকেতের ফোনে অনেকক্ষণ কথা হয়, নিকিতা কিছুতেই অনিককে বুঝতে দেয়নি, যে সেও এখনও অনিককে ভালোবাসে। একদিন নিকিতা আর তার অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে না পেরে অনিক যেখানে ভাড়া থাকত, সেখানে চলে যায়, এবং সেখানে তারা আবার পুনরায় সম্পর্কে ফিরে আসে। তারা স্বীকার করে নেয় যে, উভয়ের অনুপস্থিতি তাদের দুইজনকেই যন্ত্রণা দেয়। কিন্তু তাদের এই পুনরায় সম্পর্কে প্রত্যাবর্তন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তাদের মধ্যে আবার ঝগড়া বেঁধে যায়। সেই আবার আগের মতই তারা কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু অনিক বেচারি অনেক চেষ্টা করেছিল, নিকিতার সাথে কথা বলার কিন্তু নিকিতা পাত্তা দেয়নি। এরপর অনিক সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু নিকিতা তাকে পছন্দই করেনা, সেহেতু সে আর তাকে বিরক্ত করবেনা। সেই এই হোস্টেল ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবে, আর কোনোদিনও সে নিকিতার জীবনে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াবেনা। সে চায় সবসময় নিকিতা যেন হাঁসি-খুশি থাকে। এরপর অনিক সেই শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। প্রায় একবছর পর, নিকিতার ফোনে পুলিশ ফাঁড়ী থেকে ফোন আসে, তারা জানায় যে, তার বন্ধু অনিক রাস্তায় অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। এই কথাটি শোনার পর নিকিতা কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়, তারপর সে অঝোরে কাঁদতে থাকে। সেরা প্রেমের গল্প। হার্ট টাচিং লাভ স্টোরি সেরা প্রেমের গল্প। হার্ট টাচিং লাভ স্টোরি < এরপর যখন সে পুলিশ ষ্টেশনে যায়, তখন সে জানতে পাড়ে যে, নিকিতার মোবাইল নাম্বার অনিকের এমারজেন্সি কন্টাক্ট নাম্বারে ছিল। সেখান থেকেই নাম্বার নিয়ে তাকে ফোন করা হয়েছে। পুলিশ আরও জানায়, রাস্তা দিয়ে আনমনা হয়ে হাঁটছিল অনিক। পিছন থেকে গাড়ি হর্ন বাজালেও, সে সরে নি। ড্রাইভার ভেবছিলেন অনিক সরে যাবে, কিন্তু তা হয়নি, যার ফলে অনিকের উপর দিয়ে গাড়ি চলে যায়। এই ঘটনাটি শোনার পর, নিকিতা আবার কান্না শুরু করে দেয়। এরপর পুলিশ নিকিতাকে অনিকের মোবাইলটি দিয়ে দেয়। এই ঘটনার কয়েকদিন পর, নিকিতা অনিকের মোবাইলের ম্যাসেজ গুলি দেখছিল। সে দেখল, ড্রাফট ম্যাসেজে, লিখা আছে, – “প্রিয় নিকিতা, আমি তোমাকে কোনো দিনও ভুলবনা। তুমি যেন তোমার জীবনে সুখী হতে পারো, তাই আমি তোমার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। ভালো থেকো প্রিয়া। তুমি যার সাথেই থাকো না কেন, সুখে থাকো, আমি তোমাকে আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবেসে যাব। অনেক মিস করব তোমায়” যেহেতু নিকিতা অনিকের নাম্বার ব্লক করে রেখেছে, সেহেতু ম্যাসেজটি নিকিতার কাছে এসে পৌঁছায়নি। এটি দেখার পর নিকিতার হঠাৎ করেই উপলব্ধি হয়, যা কিছু ঘটেছে তার জন্যই ঘটেছে। সে অনিককে ignore না করলে হয়ত, একটি নিষ্পাপ প্রাণ, এভাবে যেতনা। সে নিজেকে আর কোনো দিনও ক্ষমা করতে পাড়বে না। এরপর নিকিতা তার বাকি জীবন কুমারী অবস্থাতেই কাঁটায়। সে প্রতিদিন অনিকের কবরের কাছে গিয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, আর চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়ত অশ্রুধারা। তার ইচ্ছা তার মৃত্যুর পর যেন, অনিকের পাশেই তাকেও কবর দেওয়া হয়। তার কথা মতে- “এই জীবনে তো আর হলনা, পরবর্তী জীবন আমরা একসাথে কাঁটাতে চাই।“ সুতরাং বন্ধুরা, সময় থাকতেই নিজের প্রিয়জনের যত্ন নিতে শেখো। সম্পর্কে থাকলে ঝগড়া হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু তাই বলে সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়াটা ঠিক নয়। যদি তোমরা একে-অপরকে সত্যি ভালোবেসে থাকো তাহলে, এতটুকু ঝগড়া মেনে নেওয়া যেতেই পারেই। ঝগড়া ছাড়া সম্পর্ক হয়না। কিন্তু সেই ঝগড়াকে মিটিয়ে নিয়ে, একে অপরের অভিমান মিটিয়ে দিয়ে, পুনরায় পরস্পরের কাছাকাছি আসা, সেটাই তো ভালোবাসা, সেটাই তো প্রেম। যদি এখন সামান্য ঝগড়াই মেনে নিতে না শেখো, তাহলে ভবিষ্যতে তোমরা কিভাবে একে-অপরের সাথে দিন কাটাবে? কিভাবে মিটাবে, একে-অপরের অভিমান? ভালো থেকো বন্ধু, আর যত্ন নিতে শেখো তোমার প্রিয়জনের।

শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৪

ইতিহাসের গড়, গড়ের ইতিহাস

 Kanak_Durga_Temple,_Jhargram




সেই একই জঙ্গল, সেই একই গড়, সেই একই অরণ্যের অধিকারের প্রশ্ন। শুধু সময় পাশ ফিরে শুয়েছে। কখনও তিনশো বছর আগে, একশো বছর আগে, তার পরেও বারবার… 

ষোড়শ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পড়া যাক। স্থান মধ্যপ্রদেশের মান্ডু আর রাজস্থানের মালওয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল। রাজা জগদ্দেও ধর যাত্রা শুরু করলেন সেই জঙ্গলের দিকে। সেই অঞ্চলের নাম তখনও জঙ্গলমহল, কখনও বা বড়মহল। পুরুলিয়া, মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম-সংলগ্ন অংশ, বাঁকুড়ার কিছু অংশ নিয়ে তখনকার সেই জঙ্গলমহল বা বড়মহল। রাজা— গোপীনাথ মতগজ। রাজার গড়, ডুলুং নদীর তীরে চিল্কিগড় (Chilkigarh)। সেই চিল্কিগড় দখল করতেই আসছেন রাজা জগদ্দেও, সেই মালওয়া থেকে। জঙ্গলগড়ের রাজার কাছ থেকে তাঁর নিজের দেশ, ভূমিখণ্ড জিতে নিতে কি পারবেন জগদ্দেও? শুধু রাজত্ব, দূর্গই নয়, আছে গোপীনাথের প্রতিষ্ঠিত সোনার দুর্গামূর্তি কনকদুর্গাও, যা গোপীনাথের বংশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। চিল্কিগড়ের মতো কনকদুর্গা মন্দিরও দেখবে ইতিহাসের এই পায়ে পায়ে হাঁটা। 

Kanak Durga Idol
গোপীনাথের প্রতিষ্ঠিত সোনার দুর্গামূর্তি কনকদুর্গা

কিন্তু, জগদ্দেও আসছেন কেন? এত দূর থেকে? এই চিল্কিগড়ে (Chilkigarh) কনকদুর্গা মন্দিরে কী আছে?

গড় মান্দারণেই বা কী ছিল? আরও একশো বছর আগে, গড় মান্দারণ আক্রমণ করেন জগতসিংহ। আরও আগে, মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকেই বাংলায় এসেছেন তার সেনাপতি মানসিংহ, বারো ভূইয়াঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। তারও আগে শক, হূন, পাঠান এসেছে বাংলা আক্রমণ করতে, শস্যশ্যামলা বঙ্গভূমি আকর্ষণ করেছে বহির্শত্রুদের। কখনও তারা আর ফিরে যেতে পারেনি, বাংলাতেই থেকে গেছে শাসক হয়ে। আবার আক্রমণ করে লুঠ করে ফিরে গেছে কেউ কেউ।

রাজা জগদ্দেও জিতে নেন চিল্কিগড়। রাজা গোপীনাথ, তৎকালীন কূটনীতির নিয়ম মেনে বৈবাহিক সম্পর্কের বিনিময়ে সন্ধি করেন। রাজকন্যা সুবর্ণমণির সঙ্গে বিবাহ হয় ধবলদেওর। ধবলদেও উপাধি নেন জগন্নাথ ধবলদেব, প্রতিষ্ঠা হয় ধল্লভূম রাজ্যের। যুদ্ধের সময় ভেঙে গিয়েছিল গোপীনাথ প্রতিষ্ঠিত কনকদুর্গা মন্দির। নতুন কনকদুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন জগদ্দেও। তিনশো বছরের পুরনো সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, জগদ্দেও-এর প্রতিষ্ঠা করা রাজপুতানা শৈলীর চিল্কিগড়ের শরীর, সরু হয়ে আসা ডুলুং নদী আজও সাক্ষী হয়ে থাকে এই ইতিহাসের পালাবদলের।

Kanak_Durga_Temple,_Jhargram
তিনশো বছরের পুরনো সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ

দেশে রাজার হাত থেকে রাজত্ব চলে যায়, বদলে যায় দেশজ ঐতিহ্যের গড়, মন্দির। যথারীতি বাড়ির মেয়েটিকে চলে যেতে হয় শত্রুশিবিরে। জঙ্গলমহল সাক্ষী থাকে সেই দীর্ঘনিশ্বাসের। তবু রাজা অংশীভূত হয়ে যান এই অরণ্যের, তাই হয়ত বিক্ষুব্ধ হয় না অরণ্য। এই ধল্লভূম রাজবংশ তার অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে। ঝাড়গ্রামের রাজবাড়ি দেখতে যায় সকলে, অলক্ষ্যে দেখে আসে মান্ডু-মালওয়া থেকে চিল্কিগড়ের তিনশো বছর পুরনো ইতিহাস। 

যদি এই অস্তিত্বের মিলমিশ না হয়? যদি বিরোধ ঘটে?

যেমন ঘটেছিল চুয়ার বিদ্রোহে, ১৭৭১-১৮০৯ তে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, অরণ্যের অধিকার লঙ্ঘন বারংবার আহত করেছে ধল্লভূমের মানুষের আত্মমর্যাদা। জঙ্গলমহলের ভূমিজ আদিবাসীরা, জগন্নাথ সিংহ পাত্তরের নেতৃত্বে, ধডকা ও পুরুলিয়ার পঞ্চেত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এই বিদ্রোহ। ভূমিজ সন্তানদের অপমানকর ‘চুয়ার’ শব্দে অবহিত করত জমিদার ও সাহেবরা। সেই শব্দকেই বিদ্রোহের মুখ হিসেবে বেছে নেয় তারা।






একইভাবে, ১৮৩২-৩৩ সালে বড়ভূমের, মানভূমের ও ধল্লভূমের ভূমিজ সন্তানেরা গঙ্গানারায়ণ সিংহের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বিরুদ্ধে। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল পরগণায় সংঘটিত হয় হুল বিদ্রোহ।

শুধু চুয়ার বা হুল বিদ্রোহই তো নয়, ব্রিটিশ বিরোধিতার এই গর্বের ঐতিহ্য তারা বহন করে সিপাহি বিদ্রোহের সময়েও। সেই অর্থে জঙ্গলমহলের বা ধল্লভূমের কোনও রেজিমেন্ট ছিল না, কিন্তু দেশজ রাজাদের অধীনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তারা। আদিবাসী নেতা গোনুর নেতৃত্বে সিপাহি বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ধল্লভূমে। 

লক্ষ্য করার মত বিষয়, ব্রিটিশ শাসনের এই দীর্ঘ সময়ে কখনোই বশ্যতা স্বীকার করেনি চিল্কিগড়ের, জঙ্গলমহলের ইতিহাস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, যেমন উত্তরপ্রদেশ, ঝাঁসি, যেমন কানপুর বা মিরাট তাদের পরাজয়, অসাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেছে তাদের বিদ্রোহের ইতিহাস। জঙ্গলমহলের ক্ষেত্রে তা হয়নি।

রাজা জগদ্দেওর ক্ষেত্রে আমরা যেমন প্রশ্ন করেছিলাম, কেন চিল্কিগড়? কেন জঙ্গলমহল? ব্রিটিশ শাসকের ক্ষেত্রেও সেই একই প্রশ্ন থেকে যায়— কেন ধল্লভূম?
প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মাটির উপরে অঢেল বনজ সম্পদ, মাটির নীচে অপার খনিজ ভাণ্ডার আর নামমাত্র মজুরি বা কখনও বিনা মজুরিতে পাওয়া শ্রমের ইতিহাসে।

Chilkigarh : The riverside
জঙ্গলমহলের চিল্কিগড়

অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক লাঞ্ছনার চিহ্ন বয়ে চলা জঙ্গলমহলের ইতিহাস। সেকালে জনজাতির মহিলাদের পণ্যীকরণের অতীত ছায়া আজও জড়িয়ে আছে বর্তমান আদিবাসী সংস্কৃতির পণ্যীকরণের ভিতরে। আদিবাসী গ্রামের এক্কেবারে ভেতরে গিয়ে, তাদের পরিষ্কার করে নিকোনো দাওয়ায় বসে মাদলের সুরে সাদা শাড়ি লাল পাড় পরা অপূর্ব সুন্দরী সাঁওতাল রমণীকে নাচতে দেখা, পুরুষদের ঢোল বাজাতে শোনা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। শহরের মানুষে ঘেরা মেলায় অর্থের বিনিময় নাচতে বাধ্য হওয়া আদিবাসীদের নাচের বোল যে কী করুণ! পণ্যীকরণের প্রয়োজনীয়তা হয়ত আছে তাদের কাছে, অপমানের কথা ভাবা হয়ত বিলাসিতা– কিন্তু তাতে তো অপমান মিথ্যে হয়ে যায় না। 

অপমান থাকলে, বিক্ষোভ থাকবে। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র ফুলিকে মনে পড়ে আমাদের। সাঁওতালি গয়না কিনতে চাওয়া শহুরে যুবকযুবতীর পাশাপাশি দারিদ্রের অসুস্থতার সঙ্গে যুদ্ধ করা চৌকিদারের জীবন মনে পড়ে। সত্তরের দশকে তৈরি চলচিত্র (১৯৭০), ষাটের দশকে রচিত উপন্যাসের ছবি। ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার ২৩ বছর পরের ছবি।

aranyer_dinratri

বর্তমান বদলেছে অনেকখানি, চেষ্টা করা হয়েছে সদর্থক বেশ কিছু সরকারি, বে-সরকারি পদক্ষেপের। পূর্বপুরুষের প্রতি যদি কোনও অপরাধ করি, ক্ষমা চেয়ে নিই পিতৃপক্ষে, অথবা আকাশপ্রদীশ জ্বালাবার মুহূর্তে। 

জঙ্গলমহলের পূর্বপুরুষের প্রতি আমরা সেইটুকু ক্ষমা চেয়ে নিই। তাদের গর্বের ইতিহাস, ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার ইতিহাস স্মরণ করে, তর্পণ করি। আজ চিল্কিগড় দুর্গে সরকারি অফিস, মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে থাকে সেই ভূখণ্ডে, যেখানে তিনশো বছর আগে যুদ্ধ করেছিলেন গোপীনাথ। 

হয়ত আমরা জানি সবাই। হয়ত জেনেও ভুলে গেছি। হয়ত বিক্ষোভের ইতিহাস মনে রেখেছি, দুঃখের শোষণটুকু মনে রাখিনি।
ধল্লভূম আমাদেরই ভূমি, ইতিহাসের এইটুকু তর্পণ আমরা করতেই পারি।